আবু দাউদ শরীফ - হাদীস নং ২,৭৫৬
তিনি বলেনঃ হুদায়বিয়ার (সন্ধির) সময় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাজারের বেশী সাহাবী নিয়ে (মদীনা) থেকে মক্কার দিকে ’উমরার উদ্দেশ্যে বের হন। অবশেষে যখন তিনি যুল্-হুলায়ফা নামক স্থানে পোঁছান, তখন তিনি কুরবানীর পশুগুলো চিহ্নিত করেন, মাথার চুল মুন্ডন করেন এবং ’উমরার নিয়্যতে ইহরাম বাঁধেন। রাবী এরূপে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। রাবী আরো বলেনঃ এই সফরে চলার সময় এক পর্যায়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছানিয়া উপত্যকার নিকটে পৌছায়, যেখান থেকে মক্কায় প্রবেশ করতে হয়, সেখানে তাঁকে নিয়ে তাঁর উটটি বসে পড়ে। তখন লোকেরা (সাহাবীরা) বলতে থাকেনঃ হাল-হাল(১), কাসওয়া(২) ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়েছে। তারা দু’বার এরূপ বলেন। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কাসওয়া ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়নি এবং এর স্বভাবও এরূপ নয়; বরং একে হাতীর গতিরোধকারী প্রতিহত করেছে।(৩) তারপর তিনি বলেনঃ সেই সাত্তার কসম, যার কবযায় আমার প্রাণ! আল্লাহর ঘরের মর্যাদা রক্ষার জন্য আজ কুরাইশরা আমার কাছে যা চাবে, আমি তাদেরকে তাই দেব। এরপর উষ্ট্রীকে উঠতে বলা হলে সে উঠে দাঁড়াল। তারপর তিনি রাস্তা পরিবর্তন করে হুদায়বিয়ার শেষ প্রান্তের ময়দানে একটা ঝরণার পাশে অবতরণ করেন। অতঃপর তাঁর নিকট বুদায়ল ইবন ওরাকা খুযাঈ আসে, পরে তাঁর কাছে আসে, ’উরওয়া ইবন মাসঊদ। তারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে কথাবার্তা শুরু করে। কথাবার্তা বলার এক পর্যায়ে (উরওয়া) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাঁড়ি স্পর্শ করে। এ সময় মুগীরা ইবন শো’বা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট দাঁড়িয়ে ছিলেন, যার সাথে ছিল তরবারি এবং মাথায় ছিল লৌহ শিরস্ত্রাণ। তিনি তার (’উরওয়ার) হাতের উপর তরবারির বাঁট দিয়ে আঘাত করে বলেনঃ ’’তুমি তাঁর দাঁড়ি হতে তোমার হাত সরিয়ে নাও’’। তখন ’উরওয়া তার মাথা উঁচু করে বলেঃ এই ব্যক্তি কে? তাঁরা (সাহাবীগণ) বলেনঃ ইনি মুগীরা ইবন শো’বা। তখন ’উরওয়া বলেঃ ওহে ধোঁকাবাজ! আমি কি তোমার ধোকাবাযী করে অঙ্গীকার ভংগের ব্যাপারে সন্ধি করে দিতে চেষ্টা করিনি? (আর ব্যাপার এই ছিল যে) মুগীরা অন্ধকার যুগে কয়েকজন ব্যক্তিকে তার সাথী হিসাবে নেন, পরে তিনি তাদের হত্যা করে তাদের ধন-সম্পদ নিয়ে নেন। অতঃপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট হাযির হয়ে ইসলাম কবুল করেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি তো তোমার ইসলাম গ্রহণ করাকে কবুল করলাম, কিন্তু ধন-সম্পদ যা ধোঁকাবাজীর দ্বারা অর্জন করেছ, এতে আমাদের কোন প্রয়োজন নেই। অতঃপর [মিসওয়ার (রাঃ)] হাদীছটির শেষ পর্যন্ত বর্ণনা করেন। অবশেষে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আলী (রাঃ)-কে বলেনঃ লিখ, এ হলো ঐ সন্ধিপত্র, যার ভিত্তিতে মুহাম্মাদুর রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং কুরাইশরা সন্ধি করছে। অতঃপর মুসাওবের (রাঃ) পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করেন। আলোচনাকালে সুহায়ল বলেনঃ যদি আমাদের কেহ আপনার নিকট আপনার দীন গ্রহণ করে গমন করে, তবে আপনি তাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেবেন। সন্ধিপত্র লেখা লেখির কাজ সমাপ্ত হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা উঠ, তোমাদের পশুগুলোকে কুরবানী কর এবং তোমাদের মাথা মুড়িয়ে ফেল। এ সময় কয়েকজন মহিলা ইসলাম গ্রহণ করে হিজরত করে (মুসলিমদের) কাছে চলে আসেন, যাদের ফিরিয়ে দিতে আল্লাহ্ নিষেধ করেন এবং তাদের দেন-মোহর (যা তারা তাদের স্বামীদের থেকে নিয়েছিল, তা) ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন। অতঃপর তিনি মদীনায় ফিরে আসেন। এ সময় তাঁর নিকট আবূ বাসীর নামক জনৈক কুরাইশ আসে। কুরাইশরা তাঁকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য লোক পাঠায়। তখন তিনি তাঁকে তাদের দু’ব্যক্তির হাতে সমর্পণ করেন। তারা উভয়ে তাঁকে নিয়ে (মদীনা থেকে) বের হয়, এমনকি যখন তারা যুল-হুলায়ফা নামক স্থানে পৌঁছে, তখন তারা তাদের খেজুর খাওয়ার জন্য সেখানে অবতরণ করে। তখন আবূ বাসীরের তাদের দু’জনের একজনকে বলেনঃ ওহে অমুক, আল্লাহ শপথ! আমার নিকট তোমার তরবারিখানা বেশ উত্তম মনে হচ্ছে। তখন সে ব্যক্তি তার খাপ থেকে তা বের করে বললঃ আমি একে পরীক্ষা করেছি। তখন আবূ বাসীর (রাঃ) বললেনঃ ওটা আমাকে একটু দেখাও না। তখন সে ব্যক্তি আবূ বুসাইরের হাতে তা তুলে দেয়। তখন তিনি তা দিয়ে তাকে আঘাত করেন, ফলে সে মরে যায়। দ্বিতীয় ব্যক্তি পালিয়ে যায় এবং মদীনায় গিয়ে পৌঁছে এবং সে দৌড়ে মসজিদের নববীতে প্রবেশ করে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এই ব্যক্তি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। সে বলেঃ আল্লার শপথ! আমার সাথীকে তো হত্যা করা হয়েছে এবং আমিও অবশ্য নিহত হতাম (কিন্তু পালিয়ে বেঁচেছি)। এ সময় আবূ বাসীর সেখানে এসে হাযির হন এবং বলেনঃ আল্লাহ্ তো আপনার যিম্মাদরী পূর্ণ করে দিয়েছেন। কেননা, আপনি তো আমাকে (সন্ধির শর্তানুযায়ী) তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, পরে আল্লাহ্ আমাকে তাদের কবল হতে মুক্ত করেছেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এই লোক তো যুদ্ধের উত্তেজনাদাতা, তার মায়ের প্রতি অভিসম্পাত। যদি তার সাহায্যকারী কেউ থাকতো! অতঃপর তিনি (আবূ বাসীর) যখন এ কথা শুনলেন, তখন তিনি বুঝতে পারলেন যে, তিনি তাকে আবার তাদের হাতে ফিরিয়ে দেবেন। তাই তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন এবং সমুদ্র উপকুলে চলে যান। অতঃপর আবূ জান্দাল (রাঃ)-ও পালিয়ে আবূ বাসীর এর সাথে মিলিত হন। এভাবে তাদের একটি বড় দল সেখানে জমায়েত হয়।