বুখারী শরীফ - হাদীস নং ২,১৫০
তিনি বলেন, যে দিন থেকে আমার জ্ঞান হয়েছে সে দিন থেকেই আমি আমার পিতা-মাতাকে দ্বীনের অনুসারী হিসাবেই পেয়েছি। আবূ আবদুল্লাহ (রহঃ) বলেন, আবূ সালিহ্ (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যেদিন থেকে আমার জ্ঞান হয়েছে সেদিন থেকেই আমি আমার পিতা, মাতাকে দ্বীন ইসলামের অনুসারী রূপে পেয়েছি এবং আমাদের এমন কোন দিন যায়নি, যে দিনের দু’ প্রান্ত সকাল-সন্ধ্যায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট আসেন নি। যখন মুসলিমগন কঠিন বিপদের সম্মুখীন হলেন তখন আবূ বকর (রাঃ) হাবাশা (আবিসিনিয়া) অভিমুখে হিজরতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। যখন তিনি বারকূল গিমাদ নামক স্থানে এসে পৌঁছলেন তখন ইবনু দাগিনা তার সাথে সাক্ষাত করল। সে ছিল কা’রা গোত্রের নেতা। সে বলল, হে আবূ বকর! আপনি কোথায় যেতে ইচ্ছা করেছেন? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আমার গোত্র আমাকে বের করে দিয়েছে, তাই আমি ইচ্ছা করেছি যে, দেশে দেশে ঘুরে বেড়াবো আর আমার প্রতিপালকের ইবাদত করব। ইবনু দাগিনা বলল, আপনার মত লোক বেরিয়ে যেতে পারে না এবং আপনার মত লোককে বহিষ্কার করাও চলে না। কেননা আপনি নিঃস্বকে সাহায্য করেন, আত্মীয়তার বন্ধনকে রক্ষা করেন, অক্ষমের বোঝা নিজে বহন করেন, মেহমানদারী করেন এবং দুর্যোগের সময় মানুষকে সাহায্য করেন। আমি আপনার আশ্রয়দাতা। কাজেই আপনি মক্কায় ফিরে চলুন এবং নিজ শহরে গিয়ে আপন প্রতিপালকের ইবাদত করুন। তারপর ইবনু দাগিনা আবূ বকর (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এল। সে কাফির কুরায়শদের যারা নেতা তাদের সাথে সাক্ষাত করল এবং তাদেরকে বলল, আবূ বকর (রাঃ) এর মত লোক বেরিয়ে যেতে পারে না এবং তার মত লোককে বহিষ্কার করাও চলে না। আপনারা কি এমন একজন লোককে বহিষ্কার করতে চান, যে নিঃস্বকে সাহায্য করে, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে, অক্ষমের বোঝা নিজে বহন করে, মেহমানের মেহমানদারী করে এবং দুর্যোগের সময় মানুষকে সাহায্য করে। আবূ বকর (রাঃ) কে ইবনু দাগিনার আশ্রয় প্রদান কুরায়শরা মেনে নিল এবং তারা আবূ বকর (রাঃ)-কে নিরাপত্তা দিয়ে ইবনু দাগিনাকে বলল, আপনি আবূ বকরকে বলে দিন, তিনি যেন নিজ বাড়ীতে তাঁর প্রতিপালকের ইবাদত করেন, সেখানে যেন সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেন এবং যা ইচ্ছা তা যেন পড়েন। এ ব্যাপারে তিনি যেন আমাদেরকে কোন কষ্ট না দেন এবং তিনি যেন প্রকাশ্যে সালাত ও তিলাওয়াত না করেন। কেননা, আমরা আশংকা করছি যে, তিনি (প্রকাশ্যে এ সব করে) আমাদের স্ত্রী-পুত্রদের ফিতনায় লিপ্ত না করেন। ইবনু দাগিনা এসব কথা আবূ বকর (রাঃ) কে বলল। আবূ বকর (রাঃ) নিজ বাড়ীতেই তাঁর প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকেন, নিজ বাড়ী ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ্যে সালাত আদায় এবং কুরআন তিলাওয়াত করতেন না। কিছুদিন পর আবূ বকর (রাঃ) এর মনে অন্য এক খেয়াল উদয় হল। তিনি নিজ ঘরের আংগিনায় একটি মসজিদ বানালেন এবং বেরিয়ে এসে সেখানে সালাত আদায় ও কুরআন তিলাওয়াত করতে লাগলেন। ফলে মুশরিকদের স্ত্রী-পুত্ররা তাঁর কাছে ভিড় জমাতে লাগল। তাদের কাছে তা ভাল লাগত এবং তাঁর প্রতি তারা তাকিয়ে থাকত। আবূ বকর (রাঃ) ছিলেন অতি ক্রন্দনশীল ব্যাক্তি। যখন তিনি কুরআন তিলাওয়াত করতেন তখন অশ্রু সংবরণ করতে পারতেন না। এতে কুরাইশদের নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিরা ঘাবড়িয়ে গেল। তারা ইবনু দাগিনাকে ডেকে পাঠাল। সে তাদের কাছে আসার পর তারা তাকে বলল, আমরা তো আবূ বকর (রাঃ)-কে এই শর্তে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিয়েছিলাম যে, তিনি নিজ গৃহে তাঁর প্রতিপালকের ইবাদত করবেন। কিন্তু, তিনি তা লংঘন করে নিজ গৃহের আংগিনায় মসজিদ বানিয়েছেন এবং (তাতে) প্রকাশ্যভাবে সালাত আদায় ও কুরআন তিলাওয়াত করেছেন। এতে আমাদের ভয় হচ্ছে যে, তিনি আমাদের স্ত্রী-পুত্রদের ফিতনায় লিপ্ত করবেন। কাজেই আপনি তাঁকে গিয়ে বলুন, তিনি যদি নিজ গৃহে তাঁর প্রতিপালকে ইবাদত সীমাবদ্ধ রাখতে চান তবে তিনি তা করতে পারেন। আর যদি তিনি অস্বীকার করেন এবং প্রকাশ্যে এসব করতে চান তবে আপনি তাঁকে বলুন, তিনি যেন আপনার যিম্মাদারী ফিরিয়ে দেন। কেননা আমরা যেমন আপনার সাথে আমাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ পছন্দ করি না, তেমনি আবূ বকর (রাঃ) প্রকাশ্যে ইবাদাত করাটা মেনে নিতে পারি না। ’আয়িশা (রাঃ) বলেন, তারপর ইবনু দাগিনা আবূ বকর (রাঃ) এর নিকট এসে বলল, যে শর্তে আমি আপনার যিম্মাদারী নিয়ে ছিলাম, তা আপনার জানা আছে। হয়ত আপনি সে শর্তের উপর সীমাবদ্ধ থাকুন, নয়ত আমার যিম্মাদারী আমাকে ফেরত দিন। কেননা, কোন ব্যাক্তির সাথে আমি নিরাপত্তার চুক্তি করার পর আমার পক্ষ থেকে তা ভঙ্গ করা হয়েছে, এমন একটা কথা আরব জাতি শুনতে পাক তা আমি আদৌ পছন্দ করি না। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আমি আপনার যিম্মাদারী ফেরত দিচ্ছি এবং আল্লাহর আশ্রয় লাভেই আমি সন্তুষ্ট। এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মুসলিমগণকে) বললেন, আমাকে (স্বপ্নযোগে) তোমাদের হিজরতের স্থান দেখান হয়েছে। আমি খেজুর বৃক্ষে পরিপূর্ণ একটি কংকরময় স্থান দেখলাম, যা’ দু’টি প্রান্তরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এ কথা বললেন, তখন যারা হিজরত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ মদিনার দিকেই হিজরত করলেন। আর যারা আবিনিসিয়ায় হিজরত করছিলেন তাদের কেউ কেউ মদিনার দিকে ফিরে গেলেন। আবূ বকর (রাঃ)-ও হিজরতের জন্য তৈরি হলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, আপনি অপেক্ষা করুন। কেননা, আমি নিশ্চিতভাবে আশা করছি যে, আমাকেও হিজরতের অনুমতি দেয়া হবে। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আমার পিতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক, আপনি কি আশা করেন যে, আপনিও অনুমতি পাবেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন আবূ বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গী হওয়ার উদ্দেশ্যে নিজেকে (আবিসিনিয়ায় হিজরত থেকে) বিরত রাখলেন এবং তাঁর নিকট যে দু’টি উট ছিল, তাদেরকে চার মাস ধরে বাবলা গাছের পাতা খাওয়াতে থাকলেন।