Alhashorহাদীস সম্ভার
বু

বুখারী শরীফ - হাদীস নং ২,৮৭৫

প্রায় ৭ মিনিট · ১,০১২ শব্দ

তিনি বলেন, একদা আমি আমার পরিবার-পরিজনের সাথে বসা ছিলাম, যখন রোদ প্রখর হল তখন উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) এর দূত আমার নিকট এসে বলল, আমীরুল মুমিনীন আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। আমি তার সঙ্গে রওয়ানা হয়ে উমর (রাঃ) এর নিকট পৌঁছলাম। দেখতে পেলাম, তিনি একটি চাটাইয়ের উপর বসা ছিলেন। যাতে কোন বিছানা ছিল না। আর তিনি চামড়ার একটি বালিশে হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। আমি তাঁকে সালাম করে বসে পড়লাম। তিনি বললেন, হে মালিক! তোমার গোত্রের কতিপয় লোক আমার নিকট এসেছেন। আমি তাদের জন্য স্বল্প পরিমাণ দান সামগ্রী প্রদানের আদেশ দিয়েছি। তুমি তা বুঝে নিয়ে তাদের মধ্যে বণ্টন করে দাও। আমি বললাম, হে আমিরুল মুমিনীন! এ কাজটির জন্য আমাকে ছাড়া যদি অন্য কাউকে নির্দেশ দিতেন। তিনি বললেন, ওহে তুমি তা গ্রহণ কর। আমি তাঁর কাছেই বসা ছিলাম। এমন সময় তাঁর দারোয়ান ইয়ারফা এসে বলল, উসমান ইবনুু আফফান, আবদুর রাহমান ইবনু আওফ, যুবাইর ইবনু আওয়াম ও সা’দ ইবনু আবূ ওয়াককাস (রাঃ) আপনার কাছে প্রবেশের অনুমতি চাচ্ছেন। উমর (রাঃ) বললেন, হ্যাঁ, তাঁদের আসতে দাও। তাঁরা এসে সালাম করে বসে পড়লেন। ইয়ারফা ক্ষণিক সময় পরে এসে বলল, আলী ও আব্বাস (রাঃ) আপনার সাক্ষাতের জন্য অনুমতির অপক্ষোয় আছেন। উমর (রাঃ) বললেন, হ্যাঁ, তাঁদেরকে আসতে দাও। এরূপ তাঁরা উভয়ে প্রবেশ করে সালাম করলেন এবং বসে পড়লেন। আব্বাস (রাঃ) বললেন, হে আমিরুল মুমিনীন! আমার এ ব্যাক্তির মধ্যে মীমাংসা করে দিন। বানূ নাযীরের সম্পদ থেকে আল্লাহ তা’আলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে যা দান করেছিলেন, তা নিয়ে তাঁরা উভয়ে বিরোধ করছিলেন। উসমান (রাঃ) এবং তাঁর সাথীগণ বললেন, হ্যাঁ, আমীরুল মুমিনীন! এদের মধ্যে মীমাংসা করে দিন এবং তাঁদের একজনকে অপরজন থেকে নিরুদ্ধেগ করে দিন। উমর (রাঃ) বললেন, একটু থামুন। আমি আপনাদেরকে সে মহান সত্তার শপথ দিয়ে বলছি, যার আদেশ আসমান ও যমীন স্থির রয়েছে। আপনারা কি জানেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাদের (নবীগণ) মীরাস বন্টিত হয় না। আমরা যা রেখে যাই তা সাদকারূপে গণ্য হয়? এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেকেই উদ্দেশ্য করেছেন। উসমান (রাঃ) ও তাঁর সাথীগণ বললেন, হ্যাঁ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ বলেছেন। এরপর উমর (রাঃ) আলী এবং আব্বাস (রাঃ) এর প্রতি লক্ষ্য করে বললেন, আমি আপনাদের আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি। আপনারা কি জানেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ বলেছেন? তাঁরা উভয়ে বললেন, হ্যাঁ, তিনি এরূপ বলেছেন। উমর (রাঃ) বললেন, এখন এ বিষয়টি সম্পর্কে আমি আপনাদের বুঝিয়ে বলছি। ব্যাপার হল এই যে, আল্লাহ তা’আলা ফায় (যুদ্ধ ব্যতীত লব্ধ সম্পদ) এর সম্পদ থেকে স্বীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বিশেষভাবে করেছেন যা তিনি ছাড়া কাউকে দান করেন নি। এরপর উমর (রাঃ) নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করেনঃ وَمَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَىٰ رَسُولِهِ مِنْهُمْ فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلَا رِكَابٍ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يُسَلِّطُ رُسُلَهُ عَلَىٰ مَن يَشَاءُ ۚ وَاللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ আর আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূল কে তাদের অর্থাৎ ইয়াহুদীদের নিকট থেকে যে ফায় (যুদ্ধ ব্যতীত লব্ধ সম্পদ) দিয়েছেন, তজ্জন্য তোমরা ঘোড়া কিংবা উটে আরোহণ করে যুদ্ধ করোনি। আল্লাহ তা’আলাই তো যাদের উপর ইচ্ছা তাঁর রাসূলগণকে কর্তৃত্ব দান করেন। আল্লাহ তা’আলা সর্ববষিয়ে সর্বশক্তিমান (৫৯ঃ ৬)। সুতরাং এ সকল নির্দিষ্টরূপে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সকল সম্পত্তি নিজের জন্য নির্দিষ্ট করে রাখেন নি এবং আপনাদের বাদ দিয়ে অন্য কাউকে দেননি। বরং আপনাদেরকেও দিয়েছেন এবং আপনাদের কাজেই ব্যয় করেছেন। এ সম্পত্তি থেকে যা উদ্ধৃত্ত রয়েছে, তা থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিজ পরিবার-পরিজনের বাৎসরিক খরচ নির্বাহ করতেন। এরূপ যা অবশিষ্ট থাকতো, তা আল্লাহর সম্পদে (বায়তুল মালে) জমা করে দিতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজীবন এরূপ করেছেন। আপনাদেরকে আল্লাহর কসম দিচ্ছি, আপনারা কি তা অবগত আছেন? তাঁরা বললেন, হ্যাঁ, আমরা অবগত আছি। এরপর উমর (রাঃ) আলী ও আব্বাস (রাঃ) কে লক্ষ্য কবেললেন, আমি আপনাদের উভয়কে আল্লাহর কসম দিচ্ছি, আপনারা কি এ বিষয়ে অবগত আছেন? এরূপ উমর (রাঃ) বললেন, এরপর আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ওফাত দিলেন তখন আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে দায়িত্ব প্রাপ্ত একথা বলে তিনি এ সকল সম্পত্তি তিনি নিজ দায়িত্বে নিয়ে নেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সবের আয় উৎপাদন যে সব কাজে ব্যয় করতেন, সে সকল কাজে ব্যয় করেন। আল্লাহ তা’আলা জানেন যে, তিনি এ ক্ষেত্রে সত্যবাদী, পূণ্যবান, সপথপ্রাপ্ত ও সত্যাশ্রয়ী ছিলেন। এরপর আল্লাহ তা’আলা আবূ বকর (রাঃ) কে ওফাত দেন। এখন আমি আবূ বকর (রাঃ) এর পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত। আমি আমার খিলাফতকালের প্রথম দু’বছর এ সম্পত্তি আমার দায়িত্বে রেখেছি এবং এর দ্বারা রাসুলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বকর (রাঃ) যা যা করতেন তা করেছি। আল্লাহ তা’আলাই জানেন যে, আমি এক্ষেত্রে সত্যবাদী, পূণ্যবান, সুপথপ্রাপ্ত ও সত্যাশ্রয়ী রয়েছি। এরপর এখন আপনার উভয়ে আমার নিকট এসেছেন। আর আমার সঙ্গে এ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং আপনাদের উভয়ের কথা একই। আর আপনাদের ব্যাপার একই। হে আব্বাস (রাঃ)! আপনি আমার নিকট আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রের সম্পত্তির অংশের দাবী নিয়ে এসেছেন আর আলী (রাঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন যে, ইনি আমার নিকট তাঁর স্ত্রী কর্তৃক পিতার সম্পত্তিতে প্রাপ্য অংশ নিতে এসেছেন। আমি আপনাদের উভয়কেই বলছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ’আমারা নবীগণের সম্পদ বন্টিত হয় না আমরা যা ছেড়ে যাই তা সা’দকারূপে গণ্য হয়।’ এরপর আমি সঙ্গত মনে করছি যে, এ সম্পত্তিকে আপনাদের দায়িত্বে অর্পণ করব। এখন আমি আপনাদের বলছি যে, আপনারা যদি চান, তবে আমি এ সম্পত্তি আপনাদের নিকট সমর্পণ করে দিব। এ শর্তে যে, আপনাদের উপর আল্লাহ তা’আলার প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার থাকবে, আপনারা এ সম্পত্তি আয় আমদানী সে সকল কাজে ব্যয় করবেন যে সকল কাজেরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবু বকর (রাঃ) ও আমি আমার খিলাফতকালে এযাবৎ ব্য্য করে এসেছি। তদুত্তরে আপনারা বলেছেন, এ সম্পত্তিকে আমাদের নিকট সমর্পণ করুন। আমি উক্ত শর্তের উপর আপনাদের প্রতি সমর্পণ করেছি। আপনাদেরকে (উসমান (রাঃ) ও তাঁর সাথীগণ) উদ্দেশ্য করে আমি আল্লাহর কসম দিচ্ছি যে, বলুন তো আমি কি তাদেরকে এ শর্তে এ সম্পত্তি সমর্পণ করেছি? তাঁরা বললেন, হ্যাঁ। এরপর উমর (রাঃ) আলী ও আব্বাস (রাঃ) এর প্রতি লক্ষ্য করে বললেন, আমি আপনাদের উভয়কে আল্লাহর কসম দিচ্ছি, বলুন তো আমি কি এ শর্তে আপনাদের প্রতি এ সম্পত্তি সমর্পণ করেছি? তাঁরা উভয়ে বললেন, হ্যাঁ। এরপর উমর (রাঃ) বললেন, আপনারা কি আমার নিকট এ ছাড়া অন্য কোন মীমাংসা চান? আল্লাহর কসম! যাঁর আদেশে আকাশ ও পৃথিবী আপন স্থানে প্রতিষ্ঠিত আছে, আমি এ ক্ষেত্রে এর বিপরীত কোন মীমাংসা করব না। যদি আপনারা এ শর্ত পালনে অপারগ হন, তবে এ সম্পত্তি আমার দায়িত্বে অর্পণ করুন। আপনাদের উভয়ের পক্ষ থেকে এ সম্পত্তি তত্ত্বাবধানে আমিই যথেষ্ট।

ছবি বানান