Alhashorহাদীস সম্ভার
বু

বুখারী শরীফ - হাদীস নং ৩,১২৬

প্রায় ৭ মিনিট · ৯৮৩ শব্দ

তিনি বলেন, যখন ইব্‌রাহীম (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর স্ত্রী (সারার) মাঝে যা হওয়ার হয়ে গেল, তখন ইব্‌রাহীম (আলাইহিস সালাম) (শিশুপুত্র) ইসমাঈল এবং তাঁর মাকে নিয়ে বের হলেন। তাদের সাথে একটি থলে ছিল, যাতে পানি ছিল। ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) এর মা মশক থেকে পানি পান করতেন। ফলে শিশুর জন্য তাঁর স্তন্যে দুধ বাড়তে থাকে। অবশেষে ইব্‌রাহীম (আলাইহিস সালাম) মক্কায় পৌছে হাযেরাকে (শিশুপুত্র ইসমাঈলসহ) একটি বিরাট বৃক্ষের নীচে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। এরপর ইব্‌রাহীম (আলাইহিস সালাম) আপন পরিবার (সারার) নিকট ফিরে চললেন। তখন ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) এর মা কিছু দূর পর্যন্ত তাঁর অনুসরণ করলেন। অবশেষে যখন কাদা নামক স্থানে পৌছলেন, তখন তিনি পিছনে থেকে ডেকে বললেন, হে ইব্‌রাহীম! আপনি আমাদেরকে কার কাছে রেখে যাচ্ছেন? ইব্‌রাহীম (আলাইহিস সালাম) বললেন, আল্লাহর কাছে। হাযেরা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। রাবী ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, এরপর হাযেরা (আলাইহিস সালাম) ফিরে আসলেন, তিনি মশক থেকে পানি পান করতেন আর শিশুরু জন্য (তাঁর স্তন্যের) দুধ বাড়ত। অবশেষে যখন পানি শেষ হয়ে গেল। তখন ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) এর মা বললেন, আমি যদি গিয়ে এদিকে সেদিকে তাকাতাম! তাহলে হয়ত কোন মানুষ দেখতে পেতাম। রাবী ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, এরপর ইসমাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মা গেলেন এবং সাফা পাহাড়ে উঠলেন আর এদিকে ওদিকে তাকালেন এবং কাউকে দেখেন কিনা এজন্য বিশেষভাবে তাকিয়ে দেখলেন। কিন্তু কাউকেও দেখতে পেলেন না। (এরপর যখন নীচু ভূমিতে পৌছলেন) তখন দ্রুত বেগে মারওয়া পাহাড়ে এসে গেলেন। এবং এভাবে তিনি কয়েক চক্কর দিলেন। পুনরায় তিনি (মনে মনে) বললেন, যদি গিয়ে দেখতাম যে শিশুটি কি করছে। এরপর তিনি গেলেন এবং দেখতে পেলেন যে সে তার অবস্থায়ই আছে। সে যেন মরণাপন্ন হয়ে গেছে। এতে তাঁর মন স্বস্তি পাচ্ছিল না। তখন তিনি বললেন, যদি সেখানে (আবার) যেতাম এবং এদিকে সেদিকে তাকিয়ে দেখতাম। সম্ভবতঃ কাউকে দেখতে পেতাম। এরপর তিনি গেলেন, সাফা পাহাড়ের উপর উঠলেন এবং এদিক সেদিক দেখলেন এবং গভীরভাবে তাকিয়ে দেখলেন। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেন না। এমনকি তিনি সাতটি চক্কর পূর্ণ করলেন। এরপর তিনি মনে মনে বললেন, যদি যেতাম তখন দেখতাম যে সে কি করছে। হঠাৎ তিনি একটি শব্দ শুনতে পেলেন। তখন তিনি বললেন, যদি আপনার কোন সাহায্য করার থাকে তবে আমাকে সাহায্য করুন। হঠাৎ তিনি জিবরীল (আলাইহিস সালাম) কে দেখতে পেলেন। রাবী ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, তখন তিনি (জিবরাঈল) তাঁর পায়ের গোড়ালি দ্বারা এরূপ করলেন অর্থাৎ গোড়ালি দ্বারা যমীনের উপর আঘাত করলেন। রাবী ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, তখনই পানি বেরিয়ে আসল। এ দেখে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) এর মা অস্থির হয়ে গেলেন এবং গর্ত খনন করতে লাগলেন। রাবী ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, এ প্রসঙ্গে আবূল কাসিম (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, হাযেরা (আলাইহিস সালাম) যদি একে তার অবস্থায় উপর ছেড়ে দিতেন তাহলে পানি বিস্তৃত হয়ে যেত। রাবী ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, তখন হাযেরা (আলাইহিস সালাম) পানি পান করতে লাগলেন এবং তাঁর সন্তানের জন্য তাঁর দুধ বাড়তে থাকে। রাবী ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, এরপর জুরহুম গোত্রের (ইয়ামান দেশীয়) একদল লোক উপত্যকার নীচু ভূমি দিয়ে অতিক্রম করচিল। হঠাৎ তারা দেখল কিছু পাখি উড়ছে। তারা যেন তা বিশ্বাসই করতে পারছিল না আর তারা বলতে লাগল এসব পাখি তো পানি ছাড়া কোথাও থাকতে পারে না। তখন তারা সেখানে তাদের একজন দুত পাঠাল। সে সেখানে গিয়ে দেখল, সেখানে পানি মাওজুদ আছে। তখন সে তার দলের লোকদের কাছে ফিরে আসল এবং তাদেরকে সংবাদ দিল। এরপর তারা হাযেরা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে এসে বলল, হে ইসমাঈলের মা। আপনি কি আমাদেরকে আপনার কাছে থাকা অথবা (রাবী বলেছেন), আপনার কাছে বসবাস করার অনুমতি দিবেন? (হাযেরা (আলাইহিস সালাম) তাদেরকে বসবাসের অনুমতি দিলেন এবং এভাবে অনেক দিন কেটে গেল)। এরপর তাঁর ছেলে বয়ঃপ্রাপ্ত হল। তখন তিনি (ইসমাঈল) জুরহুম গোত্রেরই একটি মেয়ে বিয়ে করলেন। রাবী ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, পুনরায় ইব্‌রাহীম (আলাইহিস সালাম) এর মনে জাগল (ইসমাঈল এবং তাঁর মা হাযেরার কথা) তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে (সারা) বললেন, আমি আমার পরিত্যক্ত পরিজনের অবস্থা সম্পর্কে খবর নিতে চাই। রাবী ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, এরপর তিনি (তাদের কাছে) আসলেন এবং সালাম দিলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ইসমাঈল কোথায়? ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) এর স্ত্রী বলল, তিনি শিকারে গিয়েছেন। ইব্‌রাহীম (আলাইহিস সালাম) বললেন, সে যখন আসবে তখন তুমি তাঁকে আমার এ নির্দেশের কথা বলবে, 'তুমি ঘরের চৌকাঠখানা বদলিয়ে ফেলবে।' ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) যখন আসলেন, তখন স্ত্রী তাঁকে খবরটি জানালেন, তখন তিনি স্ত্রীকে বললেন, তুমি সেই চৌকাঠ। অতএব তুমি তোমার পিতামাতার কাছে চলে যাও। রাবী ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, অতঃপর (তাদের কথা) ইব্‌রাহীম (আলাইহিস সালাম) এর আবার মনে পড়ল। তখন তিনি তাঁর স্ত্রী (সারা) কে বললেন, আমি আমার নির্বাসিত পরিবারের খবর নিতে চাই। এরপর তিনি সেখানে আসলেন, এবং (পুত্রবধূকে) জিজ্ঞাসা করলেন, ইসমাঈল কোথায়? ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) এর স্ত্রী বলল, তিনি শিকারে গিয়েছেন। পুত্রবধু তাঁকে বললেন, আপনি কি আমাদের এখানে অবস্থান করবেন না? কিছু পানাহার করবেন না? তখন ইব্‌রাহীম (আলাইহিস সালাম) বললেন, তোমাদের খাদ্য এবং পানীয় কি? স্ত্রী বলল, আমাদের খাদ্য হল গোশত আর পানীয় হল পানি। তখন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) দু’আ করলেন, ’হে আল্লাহ! তাদের খাদ্য এবং পানীয় দ্রব্যের মধ্যে বরকত দিন।’ রাবী ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আবূল কাসিম বলেছেন, ইব্‌রাহীম (আলাইহিস সালাম) এর দু’আর কারণেই (মক্কার খাদ্য ও পানীয় দ্রব্যের মধ্যে) বরকত রয়েছে। রাবী ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আবার কিছুদিন পর ইব্‌রাহীম (আলাইহিস সালাম) এর মনে তাঁর নির্বাসিত পরিজনের কথা জাগল। তখন তিনি তাঁর স্ত্রী (সারা) কে বললেন, আমি আমার পরিত্যক্ত পরিজনের খবর নিতে চাই। এরপর তিনি এলেন এবং ইসমাঈলের দেখা পেলেন, তিনি যমযম কূপের পিছনে বসে তাঁর একটি তীর মেরামত করেছেন। তখন ইব্‌রাহীম (আলাইহিস সালাম) ডেকে বললেন, হে ইসমাঈল! তোমার রব তাঁর জন্য একখানা ঘর নির্মাণ করতে আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনার রবের নির্দেশ পালন করুন। ইব্‌রাহিম (আলাইহিস সালাম) বললেন, তাহলে আমি তা করব অথবা তিনি অনুরূপ কিছু বলেছিলেন। এরপর উভয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ইব্‌রাহীম (আলাইহিস সালাম) ইমারাত বানাতে লাগলেন আর ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে পাথর এনে দিতে লাগলেন আর তাঁরা উভয়ে এ দু’আ করছিলেন, হে আমাদের রব! আপনি আমাদের এ কাজ কবুল করুন। আপনি তো সব কিছু শুনেন এবং জানেন রাবী বলেন, এরি মধ্যে প্রাচীর উঁচু হয়ে গেল আর বৃদ্ধ ইব্‌রাহীম (আলাইহিস সালাম) এতটা উঠতে দুর্বল হয়ে পড়লেন। তখন তিনি (মাকামে ইব্‌রাহীমের) পাথরের উপর দাঁড়ালেন। ইসমাঈল তাঁকে পাথর এগিয়ে দিতে লাগলেন আর উভয়ে এ দু’আ পড়তে লাগলেন, হে আমাদের রব! আপনি আমাদের এ কাজটুকু কবূল করুন। নিঃসন্দেহে আপনি সবকিছু শুনেন ও জানেন। (২ঃ ১২৭)

ছবি বানান