বুখারী শরীফ - হাদীস নং ৪,৫৪৮
অনুচ্ছেদঃ আল্লাহ্র বাণীঃ تَبْتَغِيْ مَرْضَاتَ أَزْوَاجِكَ 'তুমি তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি চাচ্ছ (৬৬ঃ ১) ৪৫৪৮। আবদুল আযীয ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) ... ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ) কে একটি আয়াতের (সূরা তাহরীমের) ব্যাখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞেসের জন্য আমি এক বছর ধরে চেয়েছিলেম, কিন্তু তাঁর ব্যাক্তিত্বের প্রভাবের ভয়ে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করতে পারিনি। অবশেষে একবার হাজ্জ (হজ্জ) করার উদ্দেশ্যে আমি তাঁর সাথে যাত্রা করলাম। ফিরে আসার সময় আমরা যখন কোন একটি পথ অতিক্রম করছিলাম, তখন তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণে একটি পিলু গাছের আড়ালে গেলেন। তিনি প্রয়োজন সেরে না আসা পর্যন্ত আমি সেখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলাম। এরপর তাঁর সাথে পথ চলতে চলতে বললাম, হে আমীরুল মুমিনীন! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সেই দুজন স্ত্রী কারা, যারা তাঁর বিরুদ্ধে পরস্পরকে সাহায্য করেছিল? তিনি বললেন, তারা হল আয়িশা এবং হাফসা। তারপর আমি তাঁকে বললাম, আল্লাহর কসম! আমি আপনাকে এই ব্যাপারে এক বছর আগেই জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আপনাকে আমি সম্মান করি বলে তা করতে পারিনি। উমার (রাঃ) বললেন, আমাকে জিজ্ঞেস করতে পিছপা হবে না। যদি তুমি মনে কর যে আমি জানি তাহলে জিজ্ঞেস করবে, এবং আমি যদি জানি তাহলে আমি তোমাকে বলব। এরপর উমার (রাঃ) আরও বললেন, আল্লাহর কসম! জাহেলী যুগে নারীদের কোন আধিকার আছে বলে আমরা মনে করতাম না। অবশেষে আল্লাহ তাদের সম্পর্কে যে বিধান নাযিল করার ছিল তা নাযিল করলেন এবং তাদের হক হিসেবে যা নির্দিষ্ট করার ছিল তা নির্দিষ্ট করলেন। তিনি বলেন, একদিন আমি কোন এক বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করছিলাম, এই এবস্থায় আমার স্ত্রী আমাকে বলল, কাজটি যদি আপনি এভাবে করেন (তাহলে ভালো হবে)। আমি বললাম, তোমার কি দরকার? এবং আমার কাজে তুমি মাথা ঘামাচ্ছ কেন? সে আমাকে বলল, হে খত্তাবের পুত্র! কি আশ্চর্য, আপনি চান না যে, আমি আপনার কথার উত্তর দেই, অথচ আপনার মেয়ে হাফসা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে তর্ক করেছে, এমনকি এতে তিনি পুরো একদিন রাগান্বিত ছিলেন। এ কথা শুনে উমার (রাঃ) দাঁড়িয়ে গেলেন এবং চাঁদরটি নিয়ে তার বাড়িতে চলে গেলেন। তিনি তাকে বললেন, হে আমার কন্যা! তুমি নাকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে তর্ক কর, ফলে তিনি দিনভর রাগান্বিত থাকেন? হাফসা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! আমরা তো অবশ্যই তাঁর কথার জবাব দিয়ে থাকি। উমার (রাঃ) বললেন, জেনে রাখো! আমি তোমাকে আল্লাহর শাস্তি ও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অসন্তুষ্টি সম্পর্কে সতর্ক করছি। রূপ-সৌন্দর্যের কারণে আল্লাহর রাসূলের ভালোবাসা যাকে গর্বিতা করে রেখেছে [আয়িশা (রাঃ)], সে যেন তোমাকে প্রতারিত করতে না পারে। উমার (রাঃ) বললেন, এরপর আমি সেখান থেকে বেরিয়ে উম্মে সালামা (রাঃ) এর ঘরে ঢুকলাম ও এই বিষয়ে তাঁর সাথে কথা বললাম। কারণ তাঁর সাথে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। তখন উম্মে সালামা (রাঃ) বললেন, হে খত্তাবের পুত্র! কি আশ্চর্য, তুমি প্রত্যেক বিষয়েই হস্তক্ষেপ করছ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর স্ত্রীদের বিষয়েও হস্তক্ষেপ করতে চাচ্ছ। আল্লাহর কসম! তিনি আমাকে এমন কঠোরভাবে ধরলেন যে, আমার রাগ কিছুটা কমে গেল। এরপর আমি তাঁর কাছ থেকে চলে এলাম। সেসময় আমার এক আনসার বন্ধু ছিল। সে আমার অনুপস্থিতিতে এবং আমি তার অনুপস্থিতিতে খবর (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে) সংগ্রহ করতাম। সেসময় আমরা গাসসানী বাদশাহের (আক্রমণের) ভয়ে ছিলাম। আমরা শুনেছিলাম যে সে আমদেরকে আক্রমণের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। তাই আমাদের অন্তর ভয়ে আতঙ্কিত ছিল। একদিন আমার আনসার বন্ধু অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আমার দরজায় করাঘাত করল এবং বলল, খুলুন খুলুন! আমি বললাম, গাসসানী বাদশাহ কি এসেছে? সে বলল, না, কিন্তু আরও বেশি অঘটন ঘটেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের কাছ থেকে আলাদা হলেন। আমি বললাম, হাফসা ও আয়িশার নাক ধূলায় ধূসরিত হোক। এরপর আমি কাপড় নিয়ে বেরিয়ে এলাম। গিয়ে দেখলাম, আল্লাহর রাসূল একটি উঁচু টোঙে অবস্থান করছেন। সিঁড়ি বেয়ে সেখানে উঠতে হয়। সিঁড়ির মুখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এক কালো গোলাম বসা ছিল। আমি বললাম, বলুন, উমার ইবনু খত্তাব এসেছেন। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে অনুমতি দিলেন, আমি তাঁকে এসব ঘটনা বললাম, এক পর্যায়ে আমি যখন উম্মে সালামার কথোপকথন পর্যন্ত পৌঁছলাম তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হাসলেন। এসময় তিনি একটি চাটাইয়ের উপর শুয়ে ছিলেন। চাটাই ও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাঝে আর কিছুই ছিল না। তাঁর মাথার নিচে ছিল খেজুরের ছালভর্তি চামড়ার একটি বালিশ ও পায়ের কাছে ছিল সলম গাছের পাতার একটি স্তূপ ও মাথার উপর লটকানো ছিল চামড়ার একটি মশক। আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এক পাশে চাটাইয়ের দাগ দেখে কেঁদে ফেললে তিনি বললেন, তুমি কাঁদছ কেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! কিসরা ও কায়সার পার্থিব ভোগবিলাসের মধ্যে ডুবে আছে, অথচ আপনি আল্লাহর রাসূল! তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি পছন্দ করো না যে, তারা দুনিয়া লাভ করুক, আর আমরা আখিরাত লাভ করি।