মুসলিম শরীফ - হাদীস নং ৪,৪৩৬
তিনি বলেন, বদরের যুদ্ধের দিনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকদের দিকে তাকালেন, দেখলেন যে, তারা সংখ্যায় এক হাজার ছিল। আর তাঁর সাহাবী ছিলেন তিনশ তের জন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিবলামুখী হলেন, এরপর দুহাত উঁচু করে উচ্চস্বরে তার পালনকর্তার কাছে দু’আ করতে লাগলেন, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে যে ওয়াদা দিয়েছ আমার জন্য তা পূরণ কর। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে যা প্রদানে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ, তা প্রদান কর। হে আল্লাহ! যদি মুসলিমদের এই ক্ষুদ্র সেনাদল ধ্বংস করে দাও তবে পৃথিবীতে তোমার ইবাদত করার মত আর কেউ থাকবে না। তিনি এমনিভাবে দু’হাত উঁচু করে কিবলামুখী হয়ে তার পালনকর্তার কাছে অনর্গল উচ্চস্বরে দু’আ করতে ছিলেন। এক পর্যায়ে তাঁর কাঁধ থেকে চাঁদর পড়ে গেল। এরপর আবূ বকর (রাঃ) তার কাছে এসে তার চারদ খানা তাঁর কাঁধে তুলে দিলেন। তারপর তাঁর পিছন দিক থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, হে আল্লাহর নবী! আপনার এতটুকু দুআই যথেষ্ট। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা আপনার সঙ্গে যে ওয়াদা করেছেন, তা অচিরেই পূর্ণ করবেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করলেনঃإِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنِّي مُمِدُّكُمْ بِأَلْفٍ مِنَ الْمَلاَئِكَةِ مُرْدِفِينَ (স্মরণ কর, যখন তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছিলে তখন তিনি তা কবুল করেছিলেন এবং বলেছিলেন, আমি তোমাদেরকে এক হাজার ফিরিশতা দ্বারা সাহায্য করবো যারা একের পর এক আসবে)। আবূ যুমায়ল বর্ণনা করেন যে, আমাকে ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেছেন যে, সে দিন একজন মুসলিম সৈনিক তার সামনের একজন মুশরিকের পিছনে ধাওয়া করছিলেন। এমন সময় তিনি তাঁর উপর দিক থেকে বেত্রাঘাতের শব্দ শুনতে পেলেন এবং তার উপর দিকে অশ্বারোহীর ধ্বনি শুনতে পেলেন। তিনি (অদৃশ্য অশ্বারোহী) বলছিলেন, হে হায়মুম, (ফিরিশতার ঘোড়ার নাম) সামনের দিকে অগ্রসর হও। তখন তিনি তার সামনের মুশরিক ব্যক্তির প্রতি তাকিয়ে দেখলেন যে, সে চিৎ হয়ে পড়ে আছে। এরপর দৃষ্টি করে দেখেন যে, তার নাক ক্ষতযুক্ত এবং তার মুখমন্ডল আঘাতপ্রাপ্ত। যেন কেউ তাকে বেত্রাঘাত করেছে। আহত স্থানগুলো সবুজ বর্ণ ধারণ করেছে। এরপর আনসারী ব্যক্তি রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে যাবতীয় ঘটনা বর্ণনা করলেন। তিনি বললেন, হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ। এই সাহায্য আকাশ-থেকে এসেছে। পরিশেষে সেদিন মুসলিমগণ সত্তর জন কাফিরকে হত্যা এবং সত্তর জনকে বন্দী করলেন। আবূ যুমায়ল বলেন যে, ইবনু আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, যখন যুদ্ধ বন্দীদেরকে আটক করা হল, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ সব যুদ্ধবন্দী সম্পর্কে আবূ বকর (রাঃ) এবং উমর (রাঃ) এর পরামর্শ চাইলেন। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর নবী! তারা তো আমাদের চাচাতো ভাই এবং স্বগোত্রীয়। আমি উচিত মনে করি যে, তাদের নিকট থেকে আপনি মুক্তিপণ (فِدْيَة) গ্রহণ করুন। এতে কাফিরদের উপর আমাদের শক্তি বৃদ্ধি পাবে। হতে পারে আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের তাওফীক দিবেন। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে ইবনুল খাত্তাব! এ ব্যাপারে তোমার অভিমত কি? উমর (রাঃ) বললেন, তখন আমি বললাম, আল্লাহর কসম! ইয়া রাসুলাল্লাহ! আবূ বকর যা উচিত মনে করেন আমি তা উচিত মনে করি না। আমি মনে করি যে, আপনি তাদেরকে আমাদের হস্তগত করুন। আমরা তাদের গর্দান উড়িয়ে দেব। আকিল-কে আলী-এর হাতে অর্পণ করুন। তিনি তার শিরশ্ছেদ করবেন। আর (আমার বংশের) অমুককে আমার কাছে অর্পণ করুন, আমি তার শিরশ্ছেদ করবো। কেননা তারা হল কাফিরদের মর্যাদাশালী নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। তখন আবূ বকর (রাঃ) যা বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটাই পছন্দ করলেন এবং আমি যা বললাম, তা তিনি পছন্দ করেননি। পরের দিন যখন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এলাম, তখন দেখি যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আবূ বকর (রাঃ) উভয়েই বসে কাঁদছেন। আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাকে বলুন, আপনি এবং আপনার সাথী কেন কাঁদছেন? যদি আমার মধ্যে কান্নার ভাব জাগে তাহলে আমিও কাঁদবো। আর যদি আমার কান্না না আসে তবে আপনাদের কাঁদার কারণে আমিও কান্নার ভান করবো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ফিদয়া গ্রহণের কারনে তোমার সাথীদের উপর সমাগত বিপদের কথা স্মরণ করে আমি কাঁদছি। আমার নিকট তাদের শাস্তি পেশ করা হল- এই গাছ থেকেও নিকটে। গাছটি ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকটবর্তী। (একটি গাছের দিকে লক্ষ্য করে বললেন, এ গাছের চাইতেও কাছে তোমাদের উপর সমাগত আযাব আমাকে দেখানো হয়েছে।) অতঃপর আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ (مَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُثْخِنَ فِي الأَرْضِ) إِلَى قَوْلِهِ ( فَكُلُوا مِمَّا غَنِمْتُمْ حَلاَلاً طَيِّبًا) 'পৃথিবীর বুকে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবীর জন্য সঙ্গত নয় ... যুদ্ধে যা তোমরা লাভ করেছ তা বৈধ ও উত্তম বলে তোমরা ভোগ কর।' (সূরা আনফালঃ ৬৭-৬৯) এর ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁদের জন্য মালে গনীমত হালাল করে দেন।