মুসলিম শরীফ - হাদীস নং ৪,৪৫৬
আবূ সুফিয়ান (রাঃ) মুখোমুখি (সরাসরি) এ হাদীস অবহিত করেছেন। যখন আমার মধ্যে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে (হুদায়বিয়ার) সন্ধির সময়কাল কার্যকর ছিল (ষষ্ঠ হিজরীতে) তখন আমি (সফরে) বের হলাম। যখন আমি শাম দেশে উপস্থিত হলাম, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রেরিত একটি পত্র হিরাকল (হিরাকলিয়াস) বাদশাহর নিকট পৌঁছল। দিহইয়া আল-কালবী (রাঃ) (দূত) এই পত্র নিয়ে গিয়েছিলন। তিনি সেই পত্র ’বুসরার’ প্রধান শাসনকর্তাকে প্রদান করেন। এরপর বুসরার প্রধান, হিরাকল বাদশাহর নিকট পত্রটি হস্তান্তর করেন। তখন হিরাকল বাদশাহ বললেন, এখানে ঐ লোকটির (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর) সম্প্রদায়ের কোন লোক আছে কি, যিনি নিজেকে নবী বলে দাবী করেছেন? তারা বলল, হ্যাঁ। তখন কুরায়শদের এক দল লোকের সঙ্গে আমাকেও ডাকা হল। এরপর আমরা হিরাকল বাদশাহর নিকটে প্রবেশ করলাম। আমাদেরকে তার সম্মুখেই বসান হল। তখন তিনি জিজ্ঞাস করলেন, যিনি নবী দাবী করছেন আত্মীয়তার দিক দিয়ে তোমাদের মধ্যে কে অধিক নিকটবর্তী? তখন আবূ সুফিয়ান বললেন, আমি। তখন তাঁরা আমাকে বাদশাহর সামনেই বসালেন এবং আমার সঙ্গীদেরকে আমার পিছনে বসালেন। এরপর তিনি তার দোভাষীকে ডাকলেন এবং তাকে বললেন, “আমি তাদেরকে আমার পক্ষ থেকে বলে দাও যে, আমি তাকে (আবূ সুফিয়ানকে) ঐ লোকটি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাস করব, যিনি নিজেকে নবী বলে দাবী করছেন। যদি তিনি (আবূ সুফিয়ান) আমার নিকট মিথ্যা কথা বলেন, তবে আপনারা তাকে মিথ্যাবাদী বলে ঘোষণা দেবেন। তখন আবূ সুফিয়ান বলেন, আল্লাহ্র শপথ! যদি আমার এই ভয় না হত যে, মিথ্যা বললে তা আমার নামে উদ্ধৃত হতে থাকবে তবে নিশ্চয়ই (তাঁর সম্পর্কে) মিথ্যা কথা বলতাম। অতঃপর বাদশাহ তার দোভাষীকে বললেন, তুমি তাকে (আবূ সুফিয়ানকে) জিজ্ঞাস কর, আপনাদের মাঝে ঐ লোকটির বংশ পরিচয় কেমন? আমি বললাম, তিনি আমাদের মাঝে সম্ভ্রান্ত বংশীয়। এরপর তিনি বললেন, তাঁর পিতৃ পুরুষদের মধ্যে কি কেউ কখনও বাদশাহ ছিলেন? আমি বললাম, না। এরপর তিনি জিজ্ঞাস করলেন, আপনারা কি কখনও তাঁকে এ কথা বলার পূর্বে, যা তিনি বলেছেন, মিথ্যা বলার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন? আমি বললাম না। তিনি আবার বললেন, সমাজের কোন শ্রেণীর লোক তাঁর অনুসরন করে? সম্ভ্রান্ত প্রভাবশালীরা, না দুর্বলেরা? আমি বললাম, (সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা নয়); বরং দুর্বল শ্রেণীর লোকেরা। তিনি বললেন, তাঁর অনুগামীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, না কমছে? আমি বললাম, (কমছে না), বরং (দিনদিন) বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরপর তিনি বললেন, যে সব লোক তাঁর ধর্মে প্রবেশ করছে তারা কি পরবর্তীতে তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে ধর্মান্তরিত হচ্ছে? আমি বললাম, না। এরপর তিনি বললেন, আপনারা কি কখনও তাঁর সাথে যুদ্ধ করেছেন? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আপনাদের এবং তাঁর মাঝে সংঘটিত যুদ্ধের ফলাফল কিরূপ? আমি বললাম, আমাদের এবং তাঁর মাঝে যুদ্ধের অবস্থা পালাবদল হচ্ছে। কখনও তিনি বিজয়ী হন এবং কখনও বা আমরা বিজয়ী হই। সম্রাট হিরাকল বললেন, তিনি কি (কখনও সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে) বিশ্বাস ভঙ্গ করেন? আমি বললাম না। কিন্তু আমরা বর্তমানে তাঁর সঙ্গে একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা (পর্যন্ত সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ আছি)। আমরা জানি না যে, পরিশেষে তিনি তাতে কী করবেন। আবূ সুফিয়ান বললেন, আল্লাহ্র শপথ! (প্রশ্ন উত্তরে) আমার পক্ষ হতে একথাটি ছাড়া অন্য কোন দ্বিধামূলক কথা সংযোগ করা সম্ভব হয়নি। এরপর সম্রাট হিরাকল বললেন, (আপনাদের দেশে) তাঁর (নবুওয়াত দাবীর) পূর্বে কি কোন ব্যক্তি কখনও এরূপ দাবী করেছে? আমি বললাম, না। এরপর সম্রাট হিরাকল তার দোভাষীকে বললেন, আমি তাকে (আবূ সুফিয়ানকে) বলে দাও যে, আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাঁর (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর) বংশ পরিচয় সম্পর্কে। আপনি তখন বলেছিলেন যে, তিনি সম্ভ্রান্ত বংশীয়। এমনিভাবে রাসূলগণ তাদের সম্প্রদায়ের উত্তম বংশে প্রেরিত হয়ে থাকেন। এরপরে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাঁর পিতৃ পুরুষগণের মধ্যে কি কেউ বাদশাহ ছিলন? আপনি প্রতি উত্তরে বলেছিলেন, না। আমি মনে মনে বললাম যে, যদি তাঁর পিতৃপুরুষগণের মধ্যে হতে কেউ বাদশাহ থাকতেন, তবে আমি মনে করতাম যে, হয়তবা তিনি তাঁর পিতৃপুরুষের রাজত্ব পুনরুদ্ধার করতে চান। তারপর আমি আপনাকে জিজ্ঞাস করেছিলাম, তাঁর অনুসারী কি দুর্বল শ্রেণীর লোক, না সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর লোক? আপনি বলেছিলেন, দুর্বল শ্রেণীর লোক (আমি বলছি,) তারাই রাসূলগণের অনুসারী হয়ে থাকে। এরপর আমি আপনাকে জিজ্ঞাস করেছিলাম, যে তিনি (নবুওয়াতের) যে কথা বলছেন এর পূর্বে কি আপনারা তাঁকে কখনও মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন? আপনি বলেছিলেন যে, না। এতে আমি বুঝতে পারলাম, যে ব্যক্তি (জাগতিক ব্যপারে) মানুষের সাথে মিথ্যা বলেন না, তিনি কি কারনে আল্লাহ্র উপর মিথ্যারোপ করতে যাবেন? এরপর আমি আপনাকে প্রশ্ন করেছিলাম যে, কোন ব্যাক্তি কি তাঁর ধর্ম গ্রহন করার পর তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তাঁর ধর্ম পরিত্যাগ করেছে? আপনি বলেছিলেন, না। ঈমানের প্রকৃত অবস্থা এটাই। যখন অন্তরের অন্তস্থলে একবার তা সংমিশ্রিত হয় (তখন সেখানেই স্থায়ীভাবে অবস্থান করে)। এরপর আমি জিজ্ঞাস করেছিলাম, তাঁর অনুগামীদের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে, না কমছে? আপনি বলেছিলেন, তারা সংখায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটাই হল ঈমানের পকৃত অবস্থা। তা বৃদ্ধি পেতে পেতে অবশেষে পূর্ণতা লাভ করে। এরপর আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনারা কি তাঁর সঙ্গে কোন যুদ্ধ করেছেন? আপনি বলেছিলেন, হ্যাঁ, আপনারা তাঁর সাথে যুদ্ধ করেছেন। তবে আপনাদের মাঝে ও তাঁর মাঝে-যুদ্ধের অবস্থা হল পালাবদলের মত। কখনও তিনি বিজয়ী হন, আবার কখনও আপনারা বিজয়ী হন। এভাবে রাসূলগণকে পরীক্ষার সম্মুখীন করা হয়। পরিণামে তাঁরাই বিজয়ী হয়ে থাকেন। এরপর আমি আপনাকে প্রশ্ন করেছিলাম, তিনি কি কখনও (কোন সন্ধির) চুক্তি ভঙ্গ করেন? আপনি বলেছিলেন, তিনি কোন চুক্তিভঙ্গ করেন না, এভাবে রাসূলগণ কখনও কোন চুক্তি ভঙ্গ করেন না। আর আমি আপনাকে জিজ্ঞাস করেছিলাম যে, তাঁর এই কথা (নবুওতের কথা) বলার পূর্বে কি কোন ব্যক্তি অনুরূপ কথা বলেছেন? আপনি বলেছিলেন যে, না। আমি তা এ কারনে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে ,যদি তাঁর পূর্বে কেউ এরূপ দাবী করে থাকতো , তবে আমি মনে করতাম যে, সে ব্যক্তি তাঁর পূর্বে যে কথা বলা হয়েছিল তার অনুকরণ করেছে। রাবী বলেন এরপর হিরাকল জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি আপনাদের কি করতে আদেশ করেন? আমি (আবূ সুফিয়ান) বললাম, তিনি আমাদেরকে সালাত আদায় করতে, যাকাত দিতে, আত্মীয় সম্বন্ধ অটুট রাখতে (নিকট আত্মীয় ও হকদার ব্যক্তিদের প্রতি সদ্ব্যব্যবহার করতে) এবং চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করতে (অবৈধ ও অসৌজন্যমূলক কাজ থেকে বিরত থাকতে) আদেশ করে থাকেন। তিনি (বাদশাহ হিরাকল) বললেন, আপনি তাঁর সম্পর্কে যা বললেন তাঁর অবস্থা যদি ঠিক তাই হয় তবে তিনি অবশ্যই নবী। আমি জানতাম যে, একজন নবীর আবির্ভাব ঘটবে। কিন্তু আমি ধারণা করিনি যে, তিনি আপনাদের থেকে হবেন। যদি আমি জানতাম যে, আমি তাঁর নিকট নির্বিঘ্নে পৌঁছাতে পারবো? তবে নিশ্চয়ই আমি তাঁর মুবারক পদদ্বয় ধুইয়ে দিতাম। (জেনে রেখো) নিশ্চয়ই তাঁর রাজত্ব আমার দু’পায়ের নীচ পর্যন্ত পৌঁছাবে। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চিঠিটি তলব করলেন এবং তা পাঠ (করার আদেশ) করলেন। এতে ছিল “দয়াবান দয়ালু আল্লাহ্র নামে! এটা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে রোমের প্রধান ব্যক্তি হিরাকল এর প্রতি। সালাম সেই ব্যক্তির উপর, যিনি (হিদায়াতের) সঠিক পথ অনুসরন করেন। অতঃপর নিশ্চয়ই আমি আপনাকে ইসলামের আহবান জানাচ্ছি। ইসলাম গ্রহন করুন, নিরাপদ থাকবেন। আপনি মুসলিম হউন, আল্লাহ্ আপনাকে আপনার প্রতিদান দ্বিগুণ করে দান করবেন। আর যদি আপনি (ইসলাম থেকে) বিমুখ থাকেন, তবে নিশ্চয়ই প্রজাদের পাপ আপনার উপর আরোপিত হবে। “হে আহলে কিতাব! তোমরা এসো সে কথায়, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; যে আমরা আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করব না, কোন কিছুকেই তাঁর শরীক করব না, যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় (অবাধ্য হয়) তবে বল, তোমরা সাক্ষী থাক আমরা মুসলিম” এরপর তিনি পত্র পাঠ শেষ করলে তাঁর নিকটে শোরগোল এবং হৈ চৈ হতে লাগল। এদিকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসার নির্দেশ দেয়া হল। আমরা বেরিয়ে এলাম। আবূ সুফিয়ান বলেন, আমরা যখন বেরিয়ে এলাম তখন আমি আমার সঙ্গীদের বললাম, আবূ কাবাশার পুত্রের ব্যপারটি অত্যন্ত সুদৃঢ় হয়েছে। বনী আসফার (লাল চামড়াদের) বাদশাহও তাঁকে ভয় করছে। অবশেষে এক সময় আল্লাহ্ তা’আলা আমার অন্তরে ইসলাম প্রবেশ করিয়ে দিলেন।