Alhashorহাদীস সম্ভার
মু

মুসলিম শরীফ - হাদীস নং ৭,২৩৯

প্রায় ৮ মিনিট · ১,০৬২ শব্দ

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের পূর্ববর্তী যুগে এক বাদশাহ ছিল। তাঁর ছিল এক যাদুকর। বার্ধক্যে উপনীত হয়ে সে বাদশাকে বলল, আমি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়েছি, সুতরাং একজন কিশোরকে আপনি আমার নিকট পাঠিয়ে দিন, যাকে আমি যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিব। তখন যাদুবিদ্যা শিক্ষা দেয়ার জন্য বাদশাহ তাঁর নিকট এক কিশোর (বালক) কে পাঠাল। বালকের যাত্রাপথে ছিল এক পাদ্রী। বালক তাঁর নিকট বসল এবং তাঁর কথা শুনল। তাঁর কথা বালকের পছন্দ হল। অতঃপর বালক যাদুকরের নিকট যাত্রাকালে সর্বদাই পাদ্রির নিকট যেত এবং তাঁর নিকট বসত। এরপর সে যখন যাদুকরের নিকট যেত তখন সে তাকে প্রহার করত। অবশেষে যাদুকরের ব্যাপারে সে পাদ্রির নিকট অভিযোগ করল। তখন পাদ্রি বলল, তোমার যদি যাদুকরের ব্যাপারে আশংকা হয় তবে বলবে, আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে আসতে বাঁধা দিয়েছে, আর যদি তুমি তোমার পরিবারের লোকদের ব্যাপারে আশংকাবোধ কর তবে বলবে, যাদুকর আমাকে আসতে বাঁধা দিয়েছে। এমনি একদিন হঠাৎ সে একটি ভয়ানক হিংস্র প্রাণীর সম্মুখীন হল, যা লোকদের পথ আটকিয়ে রেখেছিল। এ অবস্থা দেখে সে বলল, আজই জানতে পারব, যাদুকর উত্তম না পাদ্রী উত্তম। অতঃপর একটি পাথর হাতে নিয়ে সে বলল, হে আল্লাহ্‌! যদি যাদুকরের তরীকার তুলনায় পাদ্রীর তরীকা আপনার নিকট প্রিয় হয়, পছন্দনীয় হয়, তবে এই প্রস্তারাঘাতে এই হিংস্র প্রাণীটি নিহত করে দিন, যেন লোকজন চলাচল করতে পারে। অতঃপর সে তাঁর প্রতি পাথরটি নিক্ষেপ করল এবং উহাকে মেরে ফেলল। ফলে লোকজন আবার যাতায়াত আরম্ভ করল। এরপর সে পাদ্রীর নিকট এসে সে সম্পর্কে পাদ্রীকে সংবাদ দিল। পাদ্রী বলল, বৎস আজ তুমি তো আমার থেকেও শ্রেষ্ঠ হয়ে গিয়েছ। তোমার মর্যাদা এ পর্যন্ত পৌঁছেছে যা আমি দেখতে পাচ্ছি। তবে অচিরেই তুমি পরীক্ষার সুম্মুখীন হবে। যদি পরীক্ষার মুখোমুখি হও তবে আমার কথা বলবে না। এ দিকে বালক জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে আরোগ্য এবং লোকদের সমুদয় রোগ ব্যাধির চিকিৎসা করতে লাগল। বাদশাহের পরিষদবর্গের এক ব্যাক্তি অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাঁর সংবাদ সে শুনতে পেয়ে বহু উপহার ও উপঢৌকন নিয়ে তাঁরা তাঁর কাছে আসল এবং তাকে বলল, তুমি যদি আমাকে আরোগ্য দান করতে পার তবে এ সব মাল আমি তোমাকে দিয়ে দিব। এ কথা শুনে বালক বলল, আমি তো কাউকে আরোগ্য দান করতে পারি না। আরোগ্য তো দেন আল্লাহ্‌ তা’আলা। আপনি যদি আল্লাহর উপন ঈমান আনয়ন করেন তবে আমি আল্লাহর নিকট দু’আ করব, আল্লাহ্‌ আপনাকে আরোগ্য দান করবেন। অতঃপর তিনি আল্লাহর উপর ঈমান আনয়ন করলেন, আল্লাহ্‌ তা’আলা তাকে রোগমুক্ত করে দিলেন। অতঃপর সে বাদশাহের নিকট এসে অন্যান্য সময়ের ন্যায় এবারও বসল। বাদশাহ তাকে বললেন, তোমার দৃষ্টিশক্তি কে ফিরিয়ে দিয়েছেন? সে বলল, আমার প্রতিপালক। এ কথা শুনে বাদশাহ বলল, আমি ব্যাতিত তোমার অন্য কোন প্রতিপালকও আছে কি? সে বলল, আমার ও আপনার সকলের প্রতিপালকই আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন। অতঃপর বাদশাহ তাকে পাকড়াও করে অব্যাহতভাবে শাস্তি দিতে লাগল। অবশেষে সে বালকের কথা বলে দিন। তখন বালককে আনা হল। বাদশাহ তাকে বললেন, হে বৎস! তুমি তো যাদুতে এত দক্ষ হয়েছ যে, তুমি জন্মান্ধকে ও কুষ্ঠ রোগীকে নিরাময় করে দাও এবং এই কর সেই কর ...। সে বলল, আমি কাউকে নিরাময় করি না। আল্লাহই শিফা দান করেন। তখন বাদশাহ তাকেও পাকড়াও করে শাস্তি দিতে থাকল। অবশেষে সে পাদ্রীর কথা বলে দিল। এবার পাদ্রীকে ধরে আনা হল এবং তাকে বলা হল তুমি তোমার দ্বীন পরিত্যাগ কর। সে অস্বীকার করল, ফলে তাঁর মাথার তালুতে করাত রেখে তাকে বিদীর্ণ করে ফেল হল। এতে তাঁর দেহ দুই খণ্ড হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। অতঃপর বাদশাহর পরিষদকে আনা হল এবং তাকে বলা হল তোমার দ্বীন থেকে ফিরে আস। সে তা অস্বীকার করলে তার মাথার মাঝখানে করার রাখল এবং তাকেও দুই টুকরা করল। পরিশেষে ঐ বালকটিকে আনা হল এবং তাকেও একই কথা বলা হল যে তুমি তোমার দ্বীন থেকে ফিরে আসো। সেও অস্বীকার করল। অতঃপর বাদশাহ তাকে তাঁর করিপয় সহযোগী (কর্মচারী)’র হাওলা করে দিয়ে বলল, তোমরা তাকে অমুক পাহাড়ে নিয়ে যাও এবং তাকে সহ পাহাড়ে আরোহণ কর। পর্বত শৃঙ্গে পৌছার পর সে যদি তাঁর দ্বীন থেকে ফিরে আসে (তবে ভাল)। অন্যথা তাকে সেখান থেকে ছুঁড়ে মারবে। তারপর তাঁরা তাকে নিয়ে গেল এবং তাকে সহ পাহাড়ে আরোহণ করল। তখন সে দু’আ করে বলল, হে আল্লাহ্‌! আপনার যেভাবে ইচ্ছা তাদের ব্যাপারে আমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান (আমাকে তাদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করুন) তৎক্ষণাৎ তাদেরকে সহ পর্বত প্রকম্পিত হতে লাগল। ফলে তাঁরা পাহাড় হতে গড়িয়ে পড়ল। আর সে হেঁটে হেঁটে বাদশাহের নিকট চলে এলো। এ দেখে বাদশাহ তাকে বলল তোমরা সঙ্গীরা কোথায়? সে বলল, আল্লাহ্‌ আমার জন্য তাদের ব্যাপারে যথেষ্ট হয়েছে (আমাকে তাদের কবল থেকে রক্ষা করেছেন)। আবার বাদশাহ তাকে তাঁর কতিপয় সহচরের হাওলা করে বলল, তোমরা তাকে নিয়ে যাও এবং ক্ষুদ্র নৌকায় উঠিয়ে তাকে মাঝ সমুদ্রে নিয়ে যাও। অতঃপর সে যদি তাঁর দ্বীন থেকে ফিরে আসে তবে ভাল, অন্যথা তোমরা তাকে সমুদ্রে ফেলে দাও। তাঁরা তাকে সমুদ্রে নিয়ে গেল। এবারও সে দু’আ করে বলল, হে আল্লাহ্‌! আপনার যেভাবে ইচ্ছা তাদের ব্যাপারে আমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান (আমাকে তাদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করুন)। তৎক্ষণাৎ নৌকাটি তাদেরকে সহ উল্টে গেল। ফলে তাঁরা সকেলেই পানিতে ডুবে গেল আর ছেলেটি হেঁটে হেঁটে বাদশাহের নিকট চলে এলো। বাদশাহ তাকে বলল, তোমার সাথিরা কোথায়? সে বলল, আল্লাহ্‌ তাদের ব্যাপারে আমার জন্য যথেষ্ট হয়েছে (আমাকে তাদের কবল থেকে রক্ষা করেছেন)। অতঃপর সে বাদশাহকে বলল, তুমি আমাকে হত্যা করতে পারবে না যে পর্যন্ত না তুমি আমার নির্দেশিত পদ্ধতি মুতাবিক কাজ করবে। বাদশাহ বলল, সে আবার কি? বালক বলল, একটি ময়দানে তুমি লোকদেরকে সমবেত কর, তারপর একটি কাঠের শূলীতে আমাকে উঠিয়ে আমার তীরদানি হতে একটি তীর নিয়ে তা ধনুকের মাঝে রাখ, এরপর بِاسْمِ اللَّهِ رَبِّ الْغُلاَمِ (বালকের পালনকর্তা আল্লাহর নামে) বলে আমার দিকে তীর ছুঁড়ে মার। এ যদি কর তবে তুমি আমাকে হত্যা করতে সক্ষম হবে। তাঁর কথা মোতাবেক বাদশাহ লোকদেরকে এক ময়দানে সমবেত করল এবং তাকে একটি কাঠের শূলীতে চড়াল, অতঃপর তাঁর তীরদানী হতে একটি তীর নিয়ে তা ধনুকের মাঝে রেখে বিসমিল্লাহি রাব্বুল আলামিন বলে তাঁর দিকে ছুঁড়ে মারল। তীর তাঁর কানপট্টিতে গিয়ে বিধল। অতঃপর সে (বালক) কানপট্টিতে তীরের স্থানে নিজের হাত রাখল এবং মারা গেল। এ দেখে সমবেত লোকজন বলে উঠলآمَنَّا بِرَبِّ الْغُلاَمِ آمَنَّا بِرَبِّ الْغُلاَمِ آمَنَّا بِرَبِّ الْغُلاَمِ “আমরা এই বালকের রবের প্রতি ঈমান আনলাম”। এই সংবাদ বাদশাহকে জানানো হল এবং তাকে বলা হল লক্ষ্য করেছেন কি? আপনি যে পরিস্থিতি হতে আশংকা করছিলেন, আল্লাহর কসম! সে আশংকাজনক পরিস্থিতই আপনার মাথার উপর চেপে বসেছে। সমস্ত মানুষই বালকের রবের উপর ঈমান আনয়ন করেছে। তখন বাদশাহ রাস্তার মাথায় গর্ত খননের নির্দেশ দিল। গর্ত খনন করা হল এবং তাদের অগ্নি প্রজ্বলিত করা হল। অতঃপর বাদশাহ হুকুম করল যে, যে ব্যাক্তি তাঁর ধর্মমত বর্জন না করবে তাকে তাতে নিক্ষেপ করব, অথবা সে বলল, তাকে বলবে সে যেন অগ্নিতে প্রবেশ করে। লোকেরা তাই করল। অবশেষে এক মহিলা আসল, তাঁর সঙ্গে ছিল এক শিশু। সে অগ্নিতে পতিত হবার ব্যাপারে ইতস্তত করছিল, এ দেখে শিশু তাকে বলল, হে আম্মাজান, ধৈর্যধারণ করুন, আপনি তো সত্য দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত।

ছবি বানান