তিরমিযী শরীফ - হাদীস নং ২,৩৮৫
তিনি একবার মদীনায় উপস্থিত হয়ে দেখলেন এক ব্যক্তিকে ঘিরে লোকেরা সমবেত হয়ে আছে। তিনি বললেনঃ ইনি কে? লোকেরা বললঃ ইনি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু। (শুফাইয়া বলেনঃ) আমি তাঁর কাছে গেলাম এবং তাঁর সামনে গিয় বসে পড়লাম। তিনি তখনো লোকদের হাদীস শুনাচ্ছিলেন। তিনি যখন নিরব এবং একা হলেন আমি তাঁকে বললামঃ আমি আপনার কাছে সত্যিকার ভাবেই যাঞ্ছা করছি যে আপনি আমাকে হাদীস শুনাবেন যা আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছ থেকে শুনেছেন, বুঝেছেন এবং জেনেছেন। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেনঃ আমি তা করব। আমি অবশ্যই তোমাকে হাদীস বর্ণনা করব যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বর্ণনা করেছেন এবং আমি যা বুঝেছি ও জেনেছি। এরপর আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু কেমন জানি ভাবতন্ময়গ্রস্ত হয়ে পড়লেন। আমরা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। এরপর তিনি সম্বিত ফিরে পেলেন এবং বললেনঃ অবশ্যই আমি তোমাকে হাদীস বর্ণনা করব যে হাদীস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ঘরে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের সঙ্গে তখন তিনি এবং আমি ছাড়া আর কেউ সেখানে ছিলনা। এরপর আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু আরো গভীরভাবে উন্মনা হয়ে পড়লেন। তারপর তিনি সম্বিত ফিরে পেলেন এবং মুখ-মন্ডল মুছলেন। বললেনঃ আমি তা করব। অবশ্যই তোমাকে এমন হাদীস বর্ণনা করব যে হাদীস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বর্ণনা করেছেন। তিনি এবং আমি এই ঘরে ছিলাম। তিনি এবং আমি ছাড়া সেখানে আমাদের সঙ্গে আর কেউ ছিলনা। তারপর আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু গভীরভাবে তন্ময়াভিভূত হয়ে পড়লেন এবং বেহুশ হয়ে উপুড় হয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন। আমি তাঁকে দীর্ঘক্ষণ ঠেস দিয়ে রাখলাম। তারপর তাঁর হুশ হল। বললেনঃ রাসয়ূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা বান্দাদের মাঝে ফায়সালার জন্য নাযিল হবেন। প্রত্যেক উম্মতই সেদিন থাকবে নতজানু। প্রথম যাদের তলব হবে তারা হল কুরআনের হাফিজ, আল্লাহর পথে শহীদ এবং প্রচুর ধন-সম্পদের অধিকারী একব্যক্তি। এরপর আল্লাহ তাআলা কুরআনের পাঠক সেই ব্যক্তিকে বলবেনঃ আমার উপর যে বিষয় নাযিল করেছিলাম তোমাকে আমি কি সেই বিষয়ের জ্ঞান দেই নাই? সে বলবেঃ হ্যাঁ, অবশ্যই দিয়েছিলেন, হে আমার রব। আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ যে জ্ঞান তুমি লাভ করেছিলে তদনুসারে কি আমল করেছিলে? লোকটি বলবেঃ আমি তো রাত-দিন এই কুরআন নিয়েই কায়েম থেকেছি। আল্লাহ বলবেনঃ তুমি মিথ্যা বলছ, ফিরিশতাগণও বলবেনঃ তুমি মিথ্যা বলছ, পরে আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেনঃ তোমার নিয়্যাত ছিল তোমাকে যেন বলা হয় ’’অমুক ক্বারী’’। আর তোমাকে তা বলাও হয়েছে। এরপর ধনাঢ্য ব্যক্তিটিকে আনা হবে। আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেনঃ তোমাকে কি আমি প্রচুর বিত্ত-বৈভব দেই নি? এমনকি কারো প্রতিই তোমাকে মুখাপেক্ষী হিসাবে রাখিনি? লোকটি বলবেঃ হ্যাঁ, অবশ্যই হে আমার রব। আল্লাহ বলবেনঃ তোমাকে আমি যা দিয়েছিলাম তা দিয়ে কি আমল করেছ তুমি? লোকটি বলবেঃ তা দিয়ে আমি আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুন্ন রেখেছি এবং সাদাকা-খয়রাত করেছি। আল্লাহ বলবেনঃ তুমি মিথ্যা বলছ, ফিরিশতাগণও বলবেনঃ তুমি মিথ্যা বলছ। পরে আল্লাহ বলবেনঃ তোমার ইচ্ছা ছিল তোমাকে যেন বলা হয়, ’’অমুক ব্যক্তি খুব দানশীল’’। আর তোমাকে তা বলা হয়েছে। আল্লাহর পথে নিহত এক ব্যক্তিকে আনা হবে। আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেনঃ কিসে তুমি নিহত হয়েছিলে? লোকটি বলবেঃ আপনি আপনার পথে জিহাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাই আমি লড়াই করলাম। শেষে আপনার পথে নিহত হলাম। আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ তোমার কামনা ছিল যে, ’’তোমাকে যেন বলা হয়,’’অমুক ব্যক্তি বাহাদুর’’। আর তা তোমাকে বলা হয়েছে। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাঠুতে হাত চাপড়ালেন এবং বললেনঃ হে আবূ হুরায়রা, এই তিনজই হল আল্লাহর প্রথম মাখলুক যাদের দিয়ে কিয়ামতের দিন জাহান্নামের আগুন প্রজ্জ্বলিত করা হবে। মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর তলোয়ার বরদার আলা’ ইবন হাকীম (রহঃ) বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এল এবং আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর বরাতেই এই হাদীসটি বর্ণনা করল। তখন মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেনঃ এই তিন ব্যক্তির যদি এই অবস্থা হয় তবে অন্যান্য লোকদের কি হাল হবে? এরপর তিনি এত প্রবলভাবে কাঁদতে লাগলেন যে, আমাদের ধারণা হল তিনি বুঝি হালাক হয়ে যাবেন। আমরা বললামঃ এই লোকটি আজ অমঙ্গল নিয়ে এসেছে। পরে মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু আত্মসংবরণ করলেন এবং চেহারা থেকে অশ্রু মুছে বললেনঃ আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্য বলেছেনঃ مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لاَ يُبْخَسُونَ * أُولَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الآخِرَةِ إِلاَّ النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ যে কেউ পার্থিব জীবন ও এর শোভা কামনা করে তবে দুনিয়াতে আমি তাদের পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করি এবং সেখানে তাদের কোন কম দেওয়া হবে না। তাদের জন্য আখিরাতে জাহান্নাম ব্যতীত কিছুই নাই এবং তারা যা করে আখিরাতে তা নিষ্ফল গণ্য হবে আর তাদের কর্ম হবে নিরর্থক। (সূরা হূদ ১১ঃ ১৫, ১৬)।