বুখারী শরীফ - হাদীস নং ৩,৪০৫
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যখন ওফাত হয়, তখণ আবূ বকর (রাঃ) (স্বীয় বাসগৃহ) সুনহ-এ ছিলেন। ইসমাঈল (রাবী) বলেন, সুনহ মদিনার উঁচু এলাকার একটি স্থানের নাম। (ওফাতের সংবাদ শোনার সাথে সাথে) ওমর (রাঃ) দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাত হয় নাই। আয়িশা (রাঃ) বলেন, উমর (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম, তখন আমার অন্তরে এ বিশ্বাসই ছিল (তাঁর ওফাত হয় নাই) আল্লাহ্ অবশ্যই তাঁকে পুনরায় জীবিত করবেন। এবং তিনি কিছু সংখ্যক লোকের (মুনাফিকের) হাত-পা কেঁটে ফেলবেন। তারপর আবূ বকর (রাঃ) এলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেহারা মোবারক থেকে আবরণ সরিয়ে তাঁর ললাটে চুমু খেলেন এবং বললেন, আমার পিতা-মাতা আপনার উপর কুরবান। আপনি জীবনে মরণে পূত পবিত্র। ঐ সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আল্লাহ্ আপনাকে কখনও দু’বার মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করাবেন না। তারপর তিনি বেরিয়ে আসলেন এবং (উমর (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললেন) হে হলফকারী, ধৈর্যধারণ কর। আবূ বকর (রাঃ) যখন কথা বলতে লাগলেন, তখন উমর (রাঃ) বসে পড়লেন। আবূ বকর (রাঃ) আল্লাহ্ পাকের হামদ ও সানা বর্ণনা করে বললেন, যারা মুহাম্মদের ইবাদতকারী ছিলে তারা জেনে রাখ, মুহাম্মদ ইন্তেকাল করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করতে তারা নিশ্চিত জেনে রাখ আল্লাহ্ চিরঞ্জীব, তিনি অমর। তারপর আবূ বকর (রাঃ) এ আয়াত তিলাওয়াত করলেনঃ নিশ্চয়ই আপনি মরণশীল আর তারা সকলও মরণশীল (৩৯ঃ ৩০) আরো তিলওয়াত করলেনঃ মুহাম্মদ একজন রাসূল মাত্র। তাঁর পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছেন। তাই যদি তিনি মারা যান অথবা তিনি নিহত হন তবে কি তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে? কেউ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে সে কখনো আল্লাহর ক্ষতি করতে পারবে না। (৩ঃ১৪৪) আল্লাহ্ তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দাদেরকে পুরস্কৃত করবেন। রাবী বলেন, আবূ বকর (রাঃ)-এর এ কথাগুলি শুনে সকলই ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। রাবী বলেন, আনসারগণ সাকীফা বনূ সায়িদায়ে সা’দ ইবনু উবাইদা (রাঃ)-এর নিকট সমবেত হলেন এবং বলতে লাগলেন, আমাদের (আনসারদের) মধ্য হতে একজন আমীর হবেন এবং তোমাদের (মুহাজিরদের) মধ্য হতে একজন আমীর হবেন। আবূ বকর (রাঃ), উমর ইবনু খাত্তাব, আবূ উবাইদা ইবনু জাররাহ (রাঃ)-এ তিনজন আনসারদের নিকট গমন করলেন। উমর (রাঃ) কথা বলতে চাইলে, আবূ বকর (রাঃ) তাকে থামিয়ে দিলেন। উমর (রাঃ) বলেন, আল্লাহ কসম, আমি বক্তব্য রাখতে চেয়েছিলাম এই জন্য যে, আমি আনসারদের মাহফিলে বলার জন্য চিন্তা-ভাবনা করে এমন কিছু চমৎকার ও যুক্তিপূর্ণ কথা তৈরী করেছিলাম। যার প্রেক্ষিতে আমার ধারণা ছিল হয়তঃ আবূ বকর (রাঃ)-এর চিন্তা ভাবনা এতটা গভীরে নাও পৌছতে পারে। কিন্তু আবূ বকর (রাঃ) অত্যন্ত জোরালো ও যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য পেশ করলেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বললেন, আমীর আমাদের (মুহাজিরদের) মধ্য হতে একজন হবেন এবং তোমাদের মধ্য হতে (আনসারদের) হবেন উযীর। তখন হুবাব ইবনু মুনযির (আনসারী) (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম। আমরা আমরা এরূপ করব না। রবং আমাদের মধ্যে একজন ও আপনাদের মধ্যে একজন আমীর হবেন। কেননা কুরাইশ গোত্র অবস্থানের (মক্কা) দিক দিয়ে যেমন আরবের মধ্যস্থানে, বংশ ও রক্তের দিকে থেকেও তারা তেমনি শ্রেষ্ঠ। তাঁরা নেতৃত্বের জন্য যোগ্যতায় সবার শীর্ষে। 'তোমরা উমর (রাঃ) অথবা আবূ উবায়দা ইবনু জাররাহ (রাঃ)-এর হাতে বায়’আত করে নাও। উমর (রাঃ) বলে উঠলেন, আমরা কিন্তু আপনার হাতেই বায়’আত করব। আপনিই আমাদের নেতা। আপনিই আমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। আমাদের মাঝে আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রিয়তম ব্যাক্তি। এ বলে উমর (রাঃ) তাঁর হাত ধরে বায়’আত করে নিলেন। সাথে সাথে উপস্থিত সকলেই বায়’আত করলেন। তখন জনৈক ব্যাক্তি বলে উঠলেন, আপনারা সা’দ ইবনু উবায়দা (রাঃ)-কে মেরে ফেললেন? উমর (রাঃ) বললেন, আল্লাহ্ তাকে মেরে ফেলেছেন। আবদুল্লাহ্ ইবনু সালিম ... আয়িশা (রাঃ) বলেন, ওফাতের সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চোখ দু’টি বার বার উপর দিকে উঠছিল এবং তিনি বার বার বলছিলেন, (হে আল্লাহ্) সর্বোচ্চ বন্ধুর (আল্লাহর) সাক্ষাতের আমি আগ্রহী। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আবূ বকর ও উমর (রাঃ)-এর খুৎবা দ্বারা আল্লাহ্ তা’আলা এ চরম মুহুর্তে উম্মতকে রক্ষা করেছেন। উমর (রাঃ) জনগণকে পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এমন কিছু মানুষ আছে যাদের অন্তরে কপটতা রয়েছে আল্লাহ্ তাদের ফাঁদ থেকে উম্মতকে রক্ষা করেছেন। এবং আবূ বকর (রাঃ) লোকদিগকে সত্য সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন। হক ও ন্যায়ের পথ নির্দেশ করেছেন, তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তারপর সাহাবা কেরামও আয়াত পড়তে পড়তে প্রস্থান করেছেনঃ মুহাম্মদ একজন রাসূল মাত্র। তাঁর পূর্বে বহু রাসুলগণ গত হয়েছেন ... কৃতজ্ঞ বান্দাদের। (৩ঃ ১৪৪)। হাদিস নং - ৩৬৬৭, ৩৬৬৮, ৩৬৬৯ ও ৩৬৭০