বুখারী শরীফ - হাদীস নং ৪,১৯৬
তিনি বলেন, আবূ সুফিয়ান আমাকে সামনাসামনি হাদীস শুনিয়েছেন। আবূ সুফিয়ান বলেন, আমাদের আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির মেয়াদে আমি ভ্রমণে বের হয়ে ছিলাম। আমি তখন সিরিয়ায় অবস্থান করছিলাম। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে হিরাক্লিয়াসের নিকট থেকে একখানা পত্র পৌছান। দাহইয়াতুল কালবী এ চিঠিটা বসরাধিপতিকে দিয়েছিলেন। এরপর তিনি হিরাক্লিয়াসের নিকট পৌছিয়ে দিলেন। পত্র পেয়ে হিরাক্লিয়াস নবীর দাবিদার ব্যাক্তির গোত্রস্থি কেউ এখানে আছে কিনা জিজ্ঞাসা করলেন। তারা বলল, হ্যাঁ আছে। কয়েকজন কুরাইশীসহ আমাকে ডাকা হলে আমরা হিরাক্লিয়াসের নিকট গেলাম এবং আমাদেরকে তাঁর সম্মুখে বসালেন। এরপর তিনি বললেন, নবীর দাবিদার ব্যাক্তির তোমাদের মধ্যে নিকটতম আত্মীয় কে? আবূ সুফিয়ান বললেন, উত্তরে বললাম আমিই। তারা আমাকে তাদের সম্মুখে এবং আমার সাথীদেরকে আমার পিছনে বসালেন। তারপর দোভাষিকে ডাকলেন এবং বললেন, এদেরকে জানিয়ে দাও যে, আমি নবীর দাবিদার ব্যাক্তিটি সম্পর্কে আবূ সুফিয়ানকে কিছু জিজ্ঞাসা করলে সে যদি আমার নিকট মিথ্যা বলে তোমরা তার মিথ্যাচারিতা ধরিয়ে দিবে। আবূ সুফিয়ান বলেন, যদি তাদের পক্ষ থেকে আমাকে মিথ্যুক প্রমাণের আশংকা না থাকত তাহলে আমি মিথ্যা বলতামই। সুফিয়ান বললেন, তিনি আমাদের মধ্যে অভিজাত বংশের অধিকারী। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন যে, তাঁর পূর্বপুরুষদের কেউ কি রাজা-বাদশাহ ছিলেন? আমি বললাম, না। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যের পূর্বে তোমরা তাঁকে কখনো মিথ্যাচারের অপবাদ দিতে পেরেছ? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, সম্ভ্রান্ত ব্যাক্তিবর্গ তাঁর অনুসরণ করছে, না দুর্বলগণ? আমি বললাম, বরং দুর্বলগণ। তিনি বললেন, তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে না হ্রাস পাচ্ছে। আমি বললাম বরং বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বললেন, তাঁর ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তাঁর প্রতি ভীতশ্রদ্ধ হয়ে কেউ কি ধর্ম ত্যাগ করে? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তোমরা তাঁর বিরুদ্ধে কোন যুদ্ধ করেছ কি? আমি বললাম, জি হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফলাফল কি? আমি বললাম, আমাদের ও তাদের মধ্যে যুদ্ধের ফলাফল হলঃ একবার তিনি জয়ী হন, আর একবার আমরা জয়ী হই। তিনি বললেন, তিনি প্রতিশ্রতি ভঙ্গ করেন কি? বললাম, না। তবে বর্তমানে আমরা একটি সন্ধির মেয়াদে আছি। দেখি এতে তিনি কি করেন। আবূ সুফিয়ান বলেন, আল্লাহর শপথ এর সাথে আর অতিরিক্ত কিছু বক্তব্য সংযোজন করার সাহস আমার ছিল না। বললেন, তাঁর পূর্বে এমন কেউ কি আর দাবি করেছে? বললাম না। তারপর তিনি তার দোভাষিকে বললেন যে, একে জানিয়ে দাও যে আমি তোমাকে তোমাদের সাথে সে ব্যাক্তির বংশ মর্যাদা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তারপর তুমি বলেছ যে, সে আমাদের মধ্যে কুলীন। তদ্রুপ রাসূলগণ শ্রেষ্ঠ বংশেই জন্মগ্রহণ করে থাকেন। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে তাঁর পূর্বপুরুষের কেউ রাজা-বাদশাহ ছিলেন কিনা? তুমি বলেছ, না। তাই আমি বলছি যে, যদি তাঁর পূর্বপুরুষের কেউ রাজা-বাদশাহ থাকতেন তাহলে বলতাম তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের রাজত্ব পুনরুদ্ধার করতে চাচ্ছেন। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, দুর্বলগণ তাঁর অনুসারী না সম্ভ্রান্তগণ? তুমি বলেছ দুর্বলগণই। আমি বলেছি যে যুগে যুগে দুর্বলগণই রাসূলদের অনুসারী হয়ে থাকি। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, এ দাবির পূর্বে তোমরা তাঁকে কখনো মিথ্যাচারের অপবাদ দিয়েছিলে কি? তুমি উত্তরে বলেছ যে, না। তাতে আমি বুঝেছি যে, যে ব্যাক্তি প্রথমে মানুষদের সাথে মিথ্যাচার ত্যাগ করেন, তারপর আল্লাহর সাথে মিথ্যাচারিতা করবেন, তা হতে পারে না। আমি তোমাদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, তাঁর ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তাঁর প্রতি বিরক্ত ও অসন্তুষ্ট হয়ে কেউ ধর্ম ত্যাগ করে কিনা? তুমি বলেছ, না। আমি বলেছি, ঈমান যখন অন্তরের অন্তস্থলে একবার প্রবিষ্ট হয় তখন এ রকমই হয়। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাঁর অনুসারীরা বৃদ্ধি পাচ্ছে না হ্রাস পাচ্ছে? তুমি বলেছ, ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমি বলেছি, ঈমান পূর্ণতা লাভ করলে এ অবস্থাই হয়। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, তাঁর বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করেছ কি? তুমি বলেছ যে, যুদ্ধ করেছ এবং তার ফলাফল হচ্ছে পানি উত্তোলনের বালতির ন্যায়। কখনো তোমাদের বিরুদ্ধে তারা জয়লাভ করে আবার কখনো তাদের বিরুদ্ধে তোমরা জয়লাভ কর। এমনিভাবেই রাসূলদের পরীক্ষা করা হয়, তারপর চুড়ান্ত বিজয় তাদের পক্ষেই হয়ে থাকে। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেন কিনা? তুমি বলেছ না। তদ্রুপ রাসূলগণ প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেন না। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাঁর পূর্বে কেউ এ দাবি উত্থাপন করেছিল কিনা? তুমি বলেছ, না। আমি বলি যদি কেউ তাঁর পূর্বে এ ধরণের দাবি করে থাকত তাহলে আমি মনে করতাম এ ব্যাক্তি পূর্ববর্তী দাবির অনুসরণ করছে। আবূ সুফিয়ান বলেন, তারপর হিরাক্লিয়াস জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি তোমাদের কি কাজের নির্দেশ দেন? আমি বললাম, সালাত (নামায/নামাজ) কায়েম করতে, যাকাত প্রদান করতে, আত্মীয়তা রক্ষা করতে এবং পাপচারিতা থেকে পবিত্র থাকার নির্দেশ দেন। হিরাক্লিয়াস বললেন, তাঁর সম্পর্কে তোমার বক্তব্য যদি সঠিক হয়, তাহলে তিনি ঠিকই নবী, তিনি আবির্ভূত হবেন তা আমি জানতাম বটে তবে তোমাদের মধ্যে আবির্ভূত হবেন তা মনে করিনি। যদি আমি তাঁর সান্নিধ্যে পৌছাবার সুযোগ পেতাম তাহলে আমি তাঁর সাক্ষাতকে অগ্রাধিকার দিতাম। যদি আমি তাঁর নিকট অবস্থান করতাম তাহলে আমি তাঁর পদযুগল ধুইয়ে দিতাম। আমার নিচের জমীন পর্যন্ত তাঁর রাজত্ব বিস্তৃত লাভ করবে। আবূ সুফিয়ান বলেন, তারপর হিরাক্লিয়াস রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পত্রখানি আনতে বললেন। এরূপ পাঠ করতে বললেন। চিঠির বক্তব্য এইঃ দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে, আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে রোমের অধিপতি হিরাক্লিয়াসের প্রতি। হেদায়েতের অনুসারীর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। এরপর আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি, ইসলাম গ্রহণ করুন, মুক্তি পাবেন। ইসলাম গ্রহণ করুন, আল্লাহ তাআলা আপনাকে দ্বিগুন প্রতিদান দেবেন। আর যদি মুখ ফিরিয়ে থাকেন তাহলে সকল প্রজার পাপরাশিও আপনার উপর নিপতিত হবে। হে কিতাবিগণ! এসো সে কথায়, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবো না, কোন কিছুতেই তাঁর সাথে শরীক না করি। আর আমাদের একে অন্যকে আল্লাহ ব্যতীত প্রতিপালকরূপে গ্রহণ না করি। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বল, তোমরা সাক্ষী থাক, আমরা মুসলিম। যখন তিনি পত্র পাঠ সমাপ্ত করলেন চতুর্দিকে উচ্চ রব উঠল এবং গুঞ্জন বৃদ্ধি পেল। তারপর তাঁর নির্দেশে আমাদের বাইরে নিয়ে আসা হল। আবূ সুফিয়ান বলেন, আমরা বেরিয়ে আসার পর আমি আমার সাথীদের বললা যে, আবূ কাবশার সন্তানের ব্যাপারে তো বিস্তর প্রভাব লাভ করেছে। রোমীয় রাষ্ট্র নায়ক পর্যন্ত তাকে ভয় পায়। তখন থেকে আমার মনে এ দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দ্বীন অতি সত্বর বিজয় লাভ করবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা’আলা আমাকে ইসলামে দীক্ষিত করলেন। ইমাম যুহরী (রহঃ) বলেন, তারপর হিরাক্লিয়াস রোমের নেতৃবৃন্দকে ডেকে একটি কক্ষে একত্রিত করলেন এবং বললেন, হে রোমকগণ! তোমরা কি আজীবন সৎপথ ও সফলতার প্রত্যাশী এবং তোমাদের রাজত্ব অটুট থাকুক? এতে তারা তার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে বন্য-গর্দভের ন্যায় পলায়নরত হল। কিন্তু দরজা গুলো সবই বন্ধ পেল। এরপর বাদশাহ নির্দেশ দিলেন যে, তাদের সবাইকে আমার নিকট নিয়ে এসো। তিনি তাদের সবাইকে ডাকলেন এবং বললেন, তোমাদের ধর্মের উপর তোমাদের আস্থা কতটুকু আছে তা আমি পরীক্ষা করলাম। আমি যা আশা করেছিলাম তা তোমাদের থেকে পেয়েছি। অনন্তর সবাই তাঁকে জিজ্ঞাসা করল এবং তার উপর সন্তুষ্ট থাকল।