Alhashorহাদীস সম্ভার
মু

মুসলিম শরীফ - হাদীস নং ৩,৫৫৮

প্রায় ৭ মিনিট · ১,০০১ শব্দ

তিনি বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সহধর্মিনীগন থেকে সাময়িকভাবে পৃথক হয়ে গেলেন, তখন আমি মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলাম। আমি দেখতে পেলাম লোকেরা হাতে কংকর নিযে নাড়াচাড়া করছে (যা দুশ্চিন্তার সময় স্বাভাবিকভাবে ঘটে থাকে)। তাঁরা বলাবলি করছিল যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সহধর্মিনীগণকে তালাক দিয়ে দিয়েছেন। এই ঘটনা ছিল তাঁদের উপর পর্দার নির্দেশ আসার পূর্বেকার। উমর (রাঃ) বললেন, আমি আজই প্রকৃত ঘটনা জেনে নিব। তাই আমি আয়িশা (রাঃ) এর নিকটে গেলাম। আমি তাকে বললাম, হে আবূ বকর তনয়া! তোমার অবস্থা কি এই পর্যায়ে নেমে গিয়েছে যে, তুমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কষ্ট দিচ্ছ? তিনি বললেন, হে খাত্তাবের পূত্র! আমার ব্যাপার নিয়ে আপনি মাথা ঘামাচ্ছেন কেন? আগে নিজের ঘরের খবর নিন। তিনি বলেন, তখনই আমি হাফসা বিনত উমর (রাঃ) এর কাছে এলাম। আমি তাঁকে বললাম, হে হাফসা! তোমার অবস্থা এই পর্যায়ে গড়িয়েছে যে, তুমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কষ্ট দিচ্ছ? আল্লাহর কসম! আমি জানতে পেরেছি যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে ভালবাসেন না। আর আমি না হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই তোমাকে তালাক দিয়ে দিতেন। একথা শুনে তিনি অঝোরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। তখন আমি তাকে বললাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোথায় আছেন? সে [হাফসা (রা)] বলল, তিনি ঐ টঙ্গের কোষাগারে অবস্থান করছেন। আমি সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করলাম। তখন আমি দেখতে পেলাম যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চৌকাঠটি ছিল খেজুর গাছের কাণ্ড দিয়ে নির্মিত যা দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠানামা করতেন। আমি রাবাহকে ডাকলাম এবং বললাম, হে রাবাহ! আমার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট থেকে প্রবেশের অনুমতি নিয়ে এসো। তখন রাবাহ কামরার দিকে দৃষ্টিপাত করল। এরপর আমার দিকে ফিরে তাকাল। কিন্তু সে কিছুই বলল না। তখন আমি বললাম, হে রাবাহ! তুমি আমার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট থেকে অনুমতি নিয়ে এসো। এরপর রাবহা কামরার দিকে দৃষ্টিপাত করল এবং আমার দিকে ফিরে তাকাল। কিন্তু সে এবার ও কিছু বলল না। তখন আমি উচ্চস্বরে বললাম, হে রাবাহ! তুমি আমার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট থেকে অনুমতি নিয়ে এসো। সে সময় আমি ভেবেছিলাম যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয়ত ধারণা করছেন আমি আমার কন্যা হাফসার কারণেই এখানে এসেছি। আল্লাহ কসম! যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার গর্দান উড়িয়ে দিবার নির্দেশ দিতেন তাহলে আমি অবশ্যই তার গর্দান উড়িয়ে দিতাম। এ সব কথা আমি উচ্চস্বরেই বলছিলাম। তখন সে (রাবাহ) আমাকে ইশারায় উপরে উঠতে বলল। তখন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে প্রবেশ করলাম। সে সময় তিনি খেজুর পত্র নির্মিত একটি চাটাইয়ের উপর কাত হয়ে শোয়া ছিলেন। আমি সেখানে বসে পড়লাম। তিনি তার চাঁদরখানি তার শরীরের উপরে টেনে দিলেন। তখন এটি ছাড়া তার পরনে অন্য কোন কাপড় ছিল না আর বাহুতে চাটাইয়ের দাগ বসে গিয়েছিল। এরপর আমি স্বচক্ষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামানাদির দিকে তাকালাম। আমি সেখানে একটি পাত্রে এক সা (সাড়ে তিন কেজি পরিমাণ) এর কাছাকাছি কয়েক মুঠো যব দেখতে পেলাম। আর সলমের কিছু পাতা (এক প্রকার গাছের পাতা যা দিয়ে চামড়ায় রং করা হয়।) কামরার এক কোণায় পড়ে আছে। আরও দেখতে পেলাম ঝুলন্ত একখানা চামড়া, এ সব দেখে আমার দুই চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল। তিনি (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হে খাত্তাবের পুত্র! কিসের তোমার কান্না পেয়েছে? আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! কেন আমি কাঁদব না। এই যে চাটাই আপনার শরীরের পার্শ্বদেশে দাগ বসিয়ে দিয়েছে। আর এই হচ্ছে আপনার কোষাগার। এখানে সামান্য কিছু যা দেখলাম তা ছাড়া তো আর কিছুই নেই। পক্ষান্তরে ঐ যে রোমক বাদশাহ ও পারস্য সম্রাট, কত বিলাস বাসনে ফলমুল ও ঝরণায় পরিবেষ্টিত হয়ে আড়ম্বরপূর্ণ জীবন যাপন করছে। আর আপনি হলেন আল্লাহর রাসুল এবং তাঁর মনোনীত ব্যক্তি। আর আপনার কোষাগার হচ্ছে এই! তখন তিনি বললেন, হে খাত্তাব তনয়! তুমি কি এতে পরিতুষ্ট নও যে, আমাদের জন্য রয়েছে আখিরাত আর তাদের জন্য দুনিয়া (পার্থিব ভোগ বিলাস)? আমি বললাম, নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট। এরপর উমর (রাঃ) বলেন, যখন আমি তার সকাশে উপস্থিত হই তখন থেকেই আমি তার চেহারায় গোস্বার ছাপ দেখতে পাচ্ছিলাম। এরপর আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার সহধর্মিনীগণের কোন আচরণ আপনার মনোকষ্টের কারণ হয়েছে কি? আপনি যদি তাঁদের তিনি তালাক প্রদান করে থাকেন (তাতে আপনার কিছু আসে যায় না) সর্বশক্তিমান আল্লাহ আপনার সঙ্গে আছেন। তার সকল ফিরিশতা, জিবরীল, মীকাঈল, আমি, আবূ বকর (রাঃ) সহ সকল ঈমানদার আপনার সঙ্গে আছেন। তিনি (উমর (রাঃ) বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, আমি যখনই কোন কথা বলি তাতে প্রায়ই আমি আশাবাদী যে, আল্লাহ আমার কথা সত্য প্রমাণিত করবেন। তখন ইখতিয়ার সম্পর্কিত এই আয়াত নাযিল হলঃ “যদি নবী তোমাদের সকলকে তালাক দিয়ে দেয় তাহলে তার প্রতিপালক তোমাদের পরিবর্তে তাকে তোমাদের চাইতে উৎকৃষ্টতর সহধর্মিনী দিবেন।” (সূরা আততাহরীমঃ ৫)। “আর তোমরা দুইজন যদি নবীর বিরুদ্ধে একে অপরের পোষকতা কর তবে জেনে রাখ, আল্লাহ, জিবরীল, সৎকর্মপরায়ণ ঈমানদারগণ তার সাহায্যকারী। অধিকন্তু ফেরেশতারাও তার সাহায্যের জন্য সদা তৎপর। (সূরা তাহরীমঃ ৪)। আয়িশা বিনত আবূ বকর (রাঃ) ও হাফসা (বিনত উমর) (রাঃ) এই দু’জন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য সহধর্মিনীগণের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে আসছিল। আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি তাঁদের তালাক দিয়েছেন? তিনি বললেন, না। তখন আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি মসজিদে প্রবেশ করে দেখতে পেলাম মুসলিমরা (চিন্তাযুক্ত হয়ে) মাটির কংকর মারছে এবং বলছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সহধর্মিনীগণকে তালাক দিয়ে দিয়েছেন। এখন আমি কি তাদের কাছে গিয়ে জানিয়ে দিব যে, আপনি আপনার সহধর্মিনীদের তালাক দেননি? তিনি বললেন- হাঁ তোমার মনে চাইলে। এভাবে আমি তাঁর সঙ্গে আলাপ করতে লাগলাম। পরিশেষে দেখলাম তার চেহারা থেকে গোস্বার ছাপ একেবারে মুছে গেছে এবং তিনি এমনভাবে হাসি দিলেন যে, তার দাঁত দেখা গেল। তাঁর দাত ছিল সকলের চাইতে সুন্দর। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে নিচে নেমে এলেন এবং আমিও খেজুরগাছের কাণ্ড নির্মিত (সিঁড়ির) কাষ্ঠ ধরে নিচে নেমে এলাম। তবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনভাবে নিচে নামলেন যেন তিনি সমতল যমীনে হাটছেন। তিনি তাঁর হাত দিয়ে কাণ্ডটি স্পর্শ করেননি। আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি তো এই বালাখানায় ঊনত্রিশ দিন অবস্থান করছেন। তিনি বললেন, মাস ঊনত্রিশ দিনেও হয়ে থাকে। এরপর আমি মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে ঘোষণা করলাম, তিনি তাঁর সহধর্মিনীগণকে তালাক দেননি। তখন এই আয়াত নাযিল হল' 'যখন শাস্তি কিংবা ভয়ের কোন সংবাদ তাদের কাছে আসে তখন তারা তা প্রচার করে দেয়। যদি তারা বিষয়টি আল্লাহর রাসুল এবং নেতৃত্ব স্থানীয় ব্যক্তিদের নিকট উপস্থাপন করত তাহলে তাদের মধ্যে যারা তথ্য অনুসন্ধানী তারা এর যথার্থতা নিরুপণ করতে সক্ষম হত।' মোটকথা আমি [উমর (রাঃ)] এই বিষয়টির সঠিক তথ্য নির্ণয়ে সক্ষম হয়েছিলাম। তখন আল্লাহ তা’আলা ইখতিয়ার সস্পর্কিত আয়াত নাযিল করেন।

ছবি বানান