মুসলিম শরীফ - হাদীস নং ৩,৫৫৯
হারুন ইবনু সাঈদ আয়লী (রহঃ) ... সুলায়মান ইবন বিলাল ইয়াহইয়া থেকে এবং তিনি উবায়দ ইবন হুনায়ন থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) কে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেন, আমি দীর্ঘ এক বছর যাবত ইচ্ছা পোষণ করে আসছিলাম যে, একটি আয়াত সম্পর্কে উমর উবনুল খাত্তাব (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করব। কিন্তু আমি তার গাম্ভীর্যের কারণে তাঁকে জিজ্ঞাসা করতে সাহস পাইনি। একবার তিনি হজ্জ পালনের জন্য রওনা হলেন, আমিও তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। যখন আমরা কোন এক রাস্তা দিয়ে চলছিলাম এই সময় তিনি (প্রকৃতির) প্রয়োজনে পিলুগাছের ঝোঁপের দিকে গেলেন। আমি তাঁর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি তাঁর প্রয়োজন পূরণ করে ফিরে এলেন। এরপর আমি তাঁর সঙ্গে রওনা করলাম। (এক মওকা পেয়ে) আমি বললাম, হে আমীরুল মুমিনীন! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিনীগণের মধ্যে থেকে কোন দু’জন তাঁর অপ্রিয় কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করেছিল? তিনি বললেন, তারা ছিল হাফসা (রাঃ) ও আয়িশা (রাঃ)। (আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমি তাঁকে (উমর (রাঃ) কে) বললামঃ আল্লাহর কসম! তিনি এক বছর যাবত এই বিষয়টি সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞাসা করব বলে মনে মনে ইচ্ছা পোষণ করে আসাছিলাম, কিন্তু আপনার ভয়ের কারণে সাহস পাইনি। তিনি (উমর রা) বললেন, কখনো এরূপ করবে না বরং আমার কাছে কোন বিষয়ের জ্ঞান আছে বলে তোমার ধারণা হলে তুমি অবশ্যই সে সম্পর্কে আমার কাছে জিজ্ঞাসা করে জেনে নিবে। যদি তা আমার জানা থাকে তাহলে তোমাকে অবহিত করবই। রাবী (আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, তখন উমর (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! জাহিলী যুগে আমরা নারী জাতির জন্য কোন অধিকার স্বীকার করতাম না। এরপর আল্লাহ তাদের অধিকার সম্পর্কে যা অবতীর্ণ করার অবতীর্ণ করলেন এবং তাদের জন্য যা বণ্টন করার ছিল তা বণ্টন করে দিলেন। তিনি বলেন আমি কোন একদিন এক বিষয়ে চিন্তা করছিলাম। এমন সময় আমার স্ত্রী আমার কাছে এসে বলল, আপনি যদি এরূপ এরূপ করতেন তাহলে বেশ ভাল হত। আমি তাকে বললাম, তোমার কি হয়েছে? তুমি এখানে এলে কেন? আমি যে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করছি তাতে তুমি নাক গলাচ্ছ কেন? তখন সে বলল, হে খাত্তাবের পূত্র! আপনি তো আমাকে মুখ খুলতেই দিচ্ছেন না, কী আশ্চর্য অথচ আপনার (স্নেহের) কন্যাটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে প্রতি উত্তর করে, যার ফলে তিনি সারা দিন রাগাম্বিত অবস্থায় অতিবাহিত করেন। উমর (রাঃ) বলেন, এরপর আমি (তড়িঘড়ি) আমার চাঁদর গুটিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম এবং সোজা হাফসার কাছে পৌছিলাম। আমি তাঁকে বললাম, হে আমার কন্যা! তুমি নাকি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার প্রতি উত্তর করে থাক, যাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারা দিন রাগাম্বিত থাকেন? হাফসা (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! আমরা সত্যই তার কথার প্রতি উত্তর দিয়ে থাকি। তখন আমি বললাম, জেনে রাখ! আমি তোমাকে আল্লাহর শাস্তির ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অসন্তুষ্টির ভীতি প্রদর্শন করছি। হে আমার কন্যা! ঐ মেয়েটি যেন তোমাকে ধোকায় ফেলতে না পারে যাকে তাঁর সৌন্দর্য ও তার প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুরাগ গর্বিত করে ফেলেছে (এর দ্বারা তিনি আয়িশা (রাঃ) কে বুঝাতে চেয়েছেন)। এরপর আমি সেখানে থেকে বেরিয়ে উম্মু সালামা (রাঃ) এর কাছে গেলাম। তাঁর সাথে আমার আত্নীয়তার সস্পর্ক ছিল। আমি তাঁর সঙ্গে কথা বললাম। তখন উম্মু সালামা (রাঃ) আমাকে বললেন, কী আশ্চার্য হে খাত্তাবের পূত্র! তুমি সব কিছুতেই দখল নিতে চাচ্ছ? এমন কি তুমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সহধর্মিনীগণের মধ্যকার বিষয়ে দখল নিতে চাচ্ছ? তিনি বলেন, এই বিষয়ে উম্মু সালামা (রাঃ) এর কথা আমাকে এমনভাবে জব্দ করল যে, আমি হতোদ্যম হয়ে পড়লাম। তাই আমি তার নিকট হতে কেটে পড়লাম। এদিকে আমার একজন আনসারী বন্ধু ছিলেন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মজলিসে অনুপস্থিত থাকলে তিনি আমাকে জানাতেন এবং তিনি তাঁর মজলিসে অনুপস্থিত থাকলে আমি তার কাছে এসে তাকে (আলোচ্য বিষয়ে) জানাতাম। সে সময়ে আমরা জনৈক গাসসানী বাদশার আক্রমণের আশংকা করছিলাম। কারণ তখন আমাদের মাঝে সংবাদ (গুজব) ছড়িয়ে পড়েছিল যে, সে আমাদের উপর হামলার পাঁয়তার করছে। তাই ভয়-ভীতি ও দুশ্চিন্তায় আমাদের অন্তর ছিল আচ্ছন্ন। ইত্যবসরে আমার আনসারী বন্ধুটি এসে দরজা খটখটাতে লাগলেন এবং বললেন, খুলে দিন, খুলে দিন! আমি বললাম, তাহলে গাসসানীরা কি এসেই পড়ল। তিনি (আমার আনসারী বন্ধুটি) বললেন, (না, গাসসানীরা আসে নি) তঁবে তার চাইতেও সাংঘাতিক কিছু। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সহধর্মিনীগণকে তালাক দিয়েছেন। উমর (রাঃ) বললেন, তখন আমি বললাম, হাফসা ও আয়িশার নাক ধূলোয় মলিন হোক। এরপর আমি আমার কাপড় চোপড় পরিধান করলাম এবং ঘর থেকে বেরিয়ে সরাসরি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলাম। তখন তিনি তার টঙ্গের ভিতর ছিলেন। সেখানে খেজুর কাণ্ডের সিড়ি বেয়ে উঠতে হত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এক কৃষ্ণকায় ভৃত্য সে সিঁড়ির গোড়ায় বসা ছিল। তখন আমি তাকে বললাম, আমি উমর। আমাকে অনুমতি এনে দাও। সে অনুমতি নিয়ে এলে আমি ভিতরে প্রবেশ করে এই ঘটনা বিশদভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে খুলে বললাম। আমি যখন উম্মু সালামা (রাঃ)-এর ঘটনা পর্যন্ত পোঁছলাম, তখন তিনি মুচকি হাসি দিলেন। তিনি তখন একটি সাদামাটা চাটাইয়ের উপর (কাত হয়ে শায়িত) ছিলেন, তাঁর ও চাটাইয়ের মাঝখানে অন্য কিছুই ছিল না। তাঁর মাথার নিচে ছিল চামড়ার তৈরি একটি বালিশ যার মধ্যে খেজুর গাছের ছাল ভর্তি ছিল। তাঁর পায়ের কাছে ছিল স্তৃপকৃত সলম গাছের কিছু পাতা এবং শিয়রের কাছে ঝুলন্ত ছিল একটি কাঁচা চামড়া। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শরীরের পার্শ্বদেশে চাটাই এর দাগ দেখতে পেলাম, এতে আমি কাঁদলাম। তিনি বললেন, (হে খাত্তাব তনয়) তুমি কাঁদছ কেন? তখন আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! পারস্য সম্রাট ও রোমক সম্রাট কত বিলাস ব্যসনে কাটাচ্ছে আর আপনি হলেন, আল্লাহর রাসুল, (আপনার অবস্থা এই)। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (হে উমর) তুমি কি এতে পরিতুষ্ট নও যে, তাদের জন্য কেবল দুনিয়া (পার্থিব ভোগ-বিলাস) আর তোমার জন্য রয়েছে আখিরাত (চিরস্থায়ী সুখ-শান্তি)।