তিরমিযী শরীফ - হাদীস নং ৩,১৪৯
তিনি বলেন, আমি ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বললামঃ নাওফ বিকালী বলেন যে, বানূ ইসরাঈলী নবী মূসা খাযিরের সঙ্গে সাক্ষাতকারী মূসা এক নন। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেনঃ আল্লাহর দুশমন মিথ্যা বলেছে। আমি উবাই ইবন কা’ব রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলতে শুনেছি যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেনঃ একদিন মূসা বানূ ইসরাঈলের মাঝে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলঃ কোন ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী? তিনি বললেনঃ আমি। আল্লাহ্ তা’আলার দিকে বিষয়টি সোপর্দ না করায় তিনি তাঁর উপর অসন্তুষ্ট হন। তিনি তাঁর কাছে ওহী পাঠালেন, দুই সাগরের সঙ্গমস্থলে আমার এক বান্দা আছে সে তোমার চেয়ে বড় জ্ঞানী। মূসা (আঃ) বললেন, হে পরওয়ারদিগার, আমি কি উপায়ে তাঁর সাক্ষাত পেতে পারি? তিনি বললেনঃ একটি থলের মধ্যে একটি মাছ নাও। যেখানে গিয়ে মাছটি হারিয়ে যাবে সে স্থানেই সে আছে। তারপর তিনি রওয়ানা হলেন। সঙ্গে তাঁর খাদেম ইউশা’ ইবন নূনও চললেন। মূসা (আঃ) মাছটি একটি থলেতে রাখলেন। তিনি ও তাঁর খাদিম চলতে চলতে একটি চটানের কাছে এসে পৌঁছে মূসা ও তার খাদিম ঘুমিয়ে পড়েন। তখন থলের ভিতর মাছটি নড়ে চড়ে থলে থেকে বের হয়ে সমুদ্রে পড়ে যায়। আল্লাহ্ তা’য়ালা চলার পথে পানির ধারা বন্ধ করে দিলেন। ফলে সেটি একটি তাকের মত হয়ে যায়। মাছটির জন্য এটি একটি সুড়ঙ্গেরা মত হয়ে পড়ে আর মূসা ও তাঁর খাদেমের জন্য এক বিস্ময়কর বস্ত হয়ে দাঁড়ায়। এরপর তাঁরা বাকী দিন ও রাত্রিভর চলতে থাকেন। মূসার সাথী তাঁকে মাছের বিষয়টি বলতে ভুলে যান। সকাল হলে মূসা (আঃ) তাঁর খাদিমকে বললেনঃ আমাদের সকালের খাবার নিয়ে আস। এই সফরে আমরা বেশ ক্লান্তি অনুভব করছি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ নির্দেশিত স্থানটি অতিক্রম করা পর্যন্ত তাঁরা কোন ক্লান্তি বোধ করেননি। খাদিম বললেনঃ হায়, আপনি কি জানেন আমরা যখন চটানে আশ্রয় মাছের তখনকার ব্যাপারটি তো আমি ভুলে গিয়েছি। সে কথা বলতে শয়তান ছাড়া আর কেউ আমাকে ভুলিয়ে দেয়নি। এটি সাগরে এক আশ্চর্যজনক ভাবে পথ ধরে চলে গেছে। মূসা (আঃ) বললেনঃ সেটাই তো ছিল উদ্দীষ্ঠ স্থান। অনন্তর উভয়েই তাঁরা পদচিহ্ন ধরে পেছনে ফিরে আসলেন। সুফইয়ান (রহঃ) বলেন, লোকদের ধারণা সেই চটানের পাশে ছিল সঞ্জীবনী ঝর্ণা। কোন মৃতের গায়ে এর পানি লাগলেই তা জীবিত হযে উঠে। ঐ মাছটির কিছু অংশ খাওয়া হয়েছিল। এতদসত্ত্বেও এর উপর উক্ত পানির ফোটা পড়লেই সেটি জীবিত হয়ে উঠে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাঁরা পদচিহ্ন অনুসরণ করে পাথরটির কাছে ফিরে এলেন। সেখানে এসে কাপড় ঘোমটা দিয়ে আবৃত এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন। মূসা (আঃ) তাঁকে সালাম করলেন। লোকটি বললেনঃ এই যমিনে সালাম কোথা হতে! মূসা (আঃ) বললেনঃ আমি মূসা। লোকটি বললেনঃ বানূ ইসরাঈলের মূসা? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। লোকটি বললেনঃ হে মূসা, আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন ধরনের জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত, আল্লাহ্ তা’আলা যা আপনাকে শিখিয়েছেন। আমি তা জানি না। আর আমিও আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন এক জ্ঞান লাভ করেছি যা তিনি আমাকে শিখিয়েছেন। তা আপনি জানেন না। মূসা (আঃ) বললেনঃ সত্য পথের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে তা থেকে আপনি আমাকে শিক্ষা দিবেন- এই শর্তে আমি আপনার সঙ্গে আমি চলতে পারি কি? লোকটি বললেনঃ আপনি কিছূতেই আমার সঙ্গে ধৈর্য ধরে থাকতে পারবেন না। আর যে বিষয়ে আপনার জ্ঞানায়ত্ব নয় সে বিসয়ে আপনি কেমন করে ধৈর্যধারণ করবেন? তিনি বললেনঃ ইনশাআল্লাহ্! আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আমি আপনার আদেশ অমান্য করব না। খাযির বললেনঃ আপনি যদি আমার সাথে চলতে চান তবে কোন বিষয়ে আপনি আমাকে প্রশ্ন করবেন না, যতক্ষণ না আমি নিজে সে সম্বন্ধে আপনাকে বলি (১৮ : ৬২-৭০)। মূসা বললেন, আচ্ছা। খাযির এবং মূসা সাগরের তীর দিয়ে হেঁটে চললেন। তাঁদের পাশ দিয়ে একটি নৌকা যাচ্ছিল। তাঁরা তাতে তুলে নেওয়ার জন্য নৌকার লোকদের সঙ্গে আলাপ করলেন। তারা খাযির (আঃ)-কে চিনতে পেরে পারিশ্রমিক ছাড়াই তাদের উভয়কে তুলে নিল। এরপর খাযির (গোপনে) নৌকার একটি তক্তার দিকে লক্ষ্য করে তা সরিয়ে ফেললেন। মূসা (আঃ) তাঁকে বললেনঃ বিনা পারিশ্রমিকে এরা আমাদের বহন করল আর আপনি আরোহীদের ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য আপনি এটি বিদীর্ণ করে দিলেন! আপনি এক গুরুতর কাজ করলেন। খাযির বললেনঃ আমি কি বলিনি যে, আপনি আমার সঙ্গে কিছুতেই ধৈর্য ধরে থাকতে পারবেন না? মূসা (আঃ) বললেনঃ মেহেরবানী করে আমার ভুলের জন্য আমাকে ধরবেন না এবং আমার বিষয়ে অত্যাধিক কঠোরতা অবলম্বন করবেন না। এরপর তাঁরা নৌকা থেকে নামলেন। তাঁরা তীর দিয়ে হেঁটে চলছিলেন। এমন সময় দেখেন কতকগুলো বালকের সাথে একটি বালক খেলছে। খাযির (আঃ) সেই বালকটির মাথা ধরে তার ঘাড় মটকে তাকে হত্যা করে ফেললেন। মূসা (আঃ) তাকে বললেনঃ আপনি কি একটি নিষ্পাপ বালককে কোন প্রাণ হত্যার বিনিময় ব্যতীতই হত্যা করে ফেললেন! আপনি তো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করলেন। খাযির (আঃ) বললেনঃ আমি কি আপনাকে বলিনি যে, আপনি আমার সঙ্গে কিছুতেই ধৈর্য ধরে থাকতে পারবেন না? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এই আপত্তি প্রথমটির তুলনায় কঠোরতর। মূসা (আঃ) বললেনঃ এরপর যদি আমি আপনাকে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করি তবে আপনি আমাকে আর সঙ্গে রাখবেন না। আমার পক্ষ থেকে ওযর গ্রহণে আপনি চরমে পৌছে গিয়েছেন। এরপর তাঁরা উভয়েই চলতে চলতে এক জনপদবাসীদের কাছে পৌঁছে তাদের নিকট খাবার চাইলেন। কিন্তু তারা তাঁদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। এরপর মূসা ও খাযির তাদের একটা পতনোন্মুখ দেওয়াল ঝুঁকে পড়েছে দেখতে পেলেন। খাযির সেটিকে তাঁর হাত দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলেন। মূসা (আঃ) বললেনঃ এমন এক সম্প্রদায়! এদের কাছে আমরা এলাম কিন্তু তারা আমাদের কোনরূপ মেহমানদারী করল না এবং আমাদের খাওয়ালো না। আপনি ইচ্ছা করলে এর জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারতেন। খাযির (আঃ) বললেনঃ এখানেই আপনার ও আমার মধ্যে সম্পর্ক ছিন্ন হল। যে বিষয়ে আপনি ধৈর্যধারণ করতে পারেননি আমি সেগুলোর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করছি। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ্ তা’আলা মূসা (আঃ)-এর উপর রহম করুন। আমাদের মনোবঞ্ছা ছিল, তিনি যদি ধৈর্যধারণ করতেন তাহলে তাঁদের আরো বহু বিষয় আমাদের কাছে বিবৃত করা হতো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একটি চড়ুই পাখি এসে নৌকাটির কিনারে বসে সাগরে এক ঠোকর মারল। তখন খাযির (আঃ) মূসা (আঃ)-কে বললেনঃ সাগর থেকে এই চড়ুইটি যতটুযকু পানি আহরণ করতে পেরেছে আপনার এবং আমার জ্ঞান আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় সে পরিমাণ ছাড়া আহরণ করতে পারেনি। সাঈদ ইবন জুবায়র (রহঃ) বলেন, ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু পাঠ করতেনঃ قَالَ أَرَأَيْتَ إِذْ أَوَيْنَا إِلَى الصَّخْرَةِ فَإِنِّي نَسِيتُ الْحُوتَ وَمَا أَنْسَانِيهُ إِلاَّ الشَّيْطَانُ أَنْ أَذْكُرَهُ وَاتَّخَذَ سَبِيلَهُ فِي الْبَحْرِ عَجَبًا আরো পাঠ করতেনঃ (ذَلِكَ مَا كُنَّا نَبْغِ فَارْتَدَّا عَلَى آثَارِهِمَا قَصَصًا)। সহীহ, বুখারি, মুসলিম, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ৩১৪৯ [আল মাদানী প্রকাশনী] এ হাদীসটি হাসান-সহীহ। আবূ ইসহাক হামদানী এটি সাঈদ ইবন জুবায়র-ইবন আব্বাস-উবাই কা’ব রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন। যুহরী এটি উবায়দুল্লাহ্ ইবন আবদুল্লাহ্ ইবন উতবা (রহঃ)-ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু উবাই ইবন কা’ব রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন। আবূ মুযাহিম ফাযারকান্দী (রহঃ) বলেন, আলী ইবন মাদীনী (রহঃ) বলেছেনঃ যদিও আমার দৃঢ় সংকল্প ছিল না তবুও এই হাদীস সম্বন্ধে সুফইয়ান (রহঃ) থেকে পূর্ণ খবর শোনার জন্য হজ্জ করলাম। শেষে তাকে (فَإِنِ اتَّبَعْتَنِي فَلاَ تَسْأَلْنِي عَنْ شَيْءٍ حَتَّى أُحْدِثَ لَكَ مِنْهُ ذِكْرًا) রূপে রিওয়ায়ত করতে শুনলাম। এর আগেও হাদীসটি সুফইয়ানকে রিওয়ায়ত করতে শুনেছি তিনি পূর্ণ খবর বর্ণনা করেন নি।