মুসলিম শরীফ - হাদীস নং ৬,৭৬০
তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকের অভিযানে রওয়ানা হন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, সিরিয়ার আরব খ্রীষ্টান ও রোমকরা। ইবনু শিহাব বলেন, আমাকে আবদুর রহমান ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু কাব ইবনু মালিক (রহঃ) বলেছেন যে, আবদুল্লাহ ইবনু কাব বলেছেন, কাব ইবনু মালিক (রাঃ) অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তার সন্তানদের মধ্যে তিনি ছিলেন তার চালক। আমি কাব ইবনু মালিক (রাঃ) কে তাবুক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ না করার ইতিবৃত্ত (নিজ মুখে) বর্ণনা করতে শুনেছি। কাব ইবনু মালিক (রাঃ) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যত যুদ্ধ করেছেন তাবুক যুদ্ধ ব্যতীত এর সব কটির মধ্যেই আমি তাঁর সঙ্গে শরীক ছিলাম। তবে বদর যুদ্ধে আমি তাঁর সাথে শরীক হতে পারিনি। আর যারা (এ বছর) থেকে পশ্চাতে রয়েছে তাদের কাউকেও অভিযুক্ত করেননি। তখন তো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমগণ শুধুমাত্র কুরায়শ কাফিলার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা মুসলিম ও কাফিরদের অনির্ধারিত সময়ে সমবেত করে দেন। আকাবার রাত্রে যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের থেকে ইসলামের উপর অঙ্গীকার নিচ্ছিলেন, সে রাত্রে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। বদর যুদ্ধ যদিও মানুষের নিকট সর্বাধিক প্রসিদ্ধ, তথাপি আকাবা রজনীর পরিবর্তে বদর মুদ্ধে শরীক হওয়া আমার নিকট অধিক পছন্দনীয় নয়। তাবুক যুদ্ধে শরীক না হওয়ার ব্যাপারে আমার ঘটনা হচ্ছে এই যে, যখন এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। তখন আমি যেমন শক্তিশালী ও স্বচ্ছল ছিলাম, তেমন আর কখনো ছিলাম না। আল্লাহর কসম! এর পূর্বে এমনকি দু’টি সাওয়ারী আমি আর কখনো একত্রে জমা করতে পারিনি। কিন্তু এ যুদ্ধের সময় দু’টি সাওয়ারীর অধিকারী ছিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অভিযানে যান প্রচন্ড গরমের কালে। সফর ছিল মরু প্রান্তরের। বহু সংখ্যক শত্রুর সন্মুখীন হতে যাচ্ছিলেন। তাই তিনি বিষয়টি মুসলিমদের সামনে খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করেন, যাতে তারা যুদ্ধের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করে নিতে পারে। যুদ্ধের গতিবিধি সম্পর্কেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে জানিয়ে দিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সঙ্গে মুসলিমের সংখ্যা ছিল অনেক এবং তাদের নাম লিপিবদ্ধ ছিল না কোন সংরক্ষণকারীর কিতাবে অর্থাৎ রেজিষ্টারে সংরক্ষিত ছিল না। কাব বলেন, সুতরাং যে ব্যক্তি অনুরূপ থাকতে ইচ্ছা করে সে কমপক্ষে এ ধারণা করতে পারত যে, তার অনুপস্থিতি গোপন থাকবে, যতক্ষন না আল্লাহর পক্ষ থেকে তার সম্পর্কে ওহী নাযিল হয়। এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, যখন গাছের ফল পাকছিল এবং বৃক্ষের ছায়া ছিল আনন্দদায়ক। আর আমিও ছিলাম এগুলোর প্রতি আকৃষ্ট। অবশেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমগণ যুদ্বের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিলেন। আমিও তাঁদের সাথে যুদ্ধে শরীক হওয়ার জন্য প্রস্ততি গ্রহণের লক্ষ্যে বাড়ী থেকে সকালে বের হতাম, কিন্তু কোন প্রস্তুতি গ্রহণ না করেই ফিরে আসতাম এবং মনে মনে বলতাম, আমি তো যুদ্ধে যেতে সক্ষম, যখনই ইচ্ছা করি। আমার ব্যাপার এভাবেই চলতে লাগল। এদিকে লোকজন বাস্তব প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে লাগল। অবশেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যুষে রওয়ানা হলেন এবং তাঁর সঙ্গে মুসলিমগণও রওয়ানা হয়ে গেল। কিন্তু আমি কোন প্রস্তুতই গ্রহণ করি নি। পরদিন সকালে আমি বের হলাম। কিন্তু কোন প্রস্তুতি গ্রহণ না করেই ফিরে এলাম। এভাবে আমার সময় দীর্ঘায়িত হতে লাগল। এদিকে লোকজন দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয় আর মুজাহিদীনের দল বহু দুরে চলে যায়। তখন আমি ভাবতে লাগনাম যে, আমিও রওয়ানা হয়ে তাদের সাথে মিলিত হয়ে যাই। আফসোস! আমি যদি তাই করতাম। কিন্তু আমার ভাগ্যে তা হয়নি। পরবর্তী অবস্থা হল এই যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুদ্ধে চলে যাওয়ার পর আমি যখন রাস্তায় বের হতাম তখন এ ব্যাপার আমাকে ব্যথিত করত যে, আমি অনুসরনীয় কাউকে দেখতে পেতাম না, শুধু এমন লোক যাদের উপর নিফাকের অভিযোগ রয়েছে অথবা সে সকল অক্ষম লোক যাদের আল্লাহ তাআলা মা’যুর হিসেবে অবকাশ দিয়েছেন। এদিকে তাবুক পৌছার পূর্বে রাস্তায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কথা মোটেই আলোচনা করেননি। কিন্তু তাবুক পৌছার পর লোকদের মাঝে বসা অবস্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, কা’ব ইবনু মালিক কি করছে? তখন বনূ সালমা গোত্রের এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! তার লাল (জোড়া) পোশাক এবং তার দেহের দু’ পাশের প্রতি দৃষ্টি তাকে বিরত রেখেছে। তখন মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ) বললেন, তুমি বড় মন্দ কথা বলছ। ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহর কসম! আমরা তো তাকে ভালই জানি। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নীরব রইলেন। ইতোমধ্যে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শুভ্র বসন পরিহিত এক ব্যক্তিকে ধূলা উড়িয়ে আসতে দেখে বললেন, আবূ খায়সামাই হবে। দেখা গেল, তিনি আনসারী সাহাবী আবূ খায়সামা (রাঃ) আর তিনি সে ব্যক্তি যিনি এক সা খেজুর সাদাকা করেছিলেন যাতে মুশরিকরা বিরূপ সমালোচনা করেছিল। কাব ইবনু মালিক (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক থেকে প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার সংবাদ আমার নিকট পৌছার পর আমার উপর চিন্তার বোঝা নেমে এল। আমি মনে মনে মিথ্যা ওযর কল্পনা করতে লাগলাম এবং এমন কথা ভাবতে লাগলাম যা বলে আমি তার ক্রোধ থেকে বাচতে পারি। আর এ ব্যাপারে আমি বুদ্ধিমান আপন জনেরও সাহায্য নিতে লাগলাম। অবশেষে যখন আমাকে বলা হল যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৌছেই তখন আমার অন্তর থেকে সমস্ত বাড়িল কল্পনা দূর হয়ে গেল। এমনকি আমি অনুভব করলাম যে, কোন কিছুতেই আমি তার কাছ থেকে অব্যাহতি পাবনা। তাই আমি তার কাছে সত্য বলারই সংকল্প করে নিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভোর বেলা সফর থেকে আগমন করলেন। তাঁর অভ্যাস ছিল, সফর থেকে প্রত্যাবর্তন করে প্রথমে তিনি মসজিদে আসতেন এবং তথায় দু’রাক’আত (সালাত) আদায় করে মানুষের সাথে সাক্ষাতের জন্য বসতেন। এবারও যখন তিনি বসলেন, তখন যারা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেনি তারা এসে অজুহাত পেশ করতে শুরু করল এবং এর উপর কসম খেতে লাগল। এ সকল লোক সংখ্যায় আশির অধিক ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রকাশ্য ওজুহাত গ্রহণ করলেন এবং তাদের থেকে বায়াআত নিয়ে তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। আর তাদের অন্তর্নিহিতা অবস্থা আল্লাহর উপর ন্যস্ত করলেন। অবশেষে আমি উপস্থিত হয়ে সালাম করলাম। তখন তিনি ক্রুদ্ধ ব্যক্তির হাসির ন্যায় অস্পষ্ট হাসলেন। তারপর তিনি বললেন, এস। আমি এসে তাঁর সামনে বসলাম। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কিসে তোমাকে পশ্চাতে রেখেছিল? তুমি কি সাওয়ারী ক্রয় করনি? তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি যদি আপনি ছাড়া কোন দুনিয়াদার মানুষের নিকট বসতাম তবে আপনি দেখতেন যে অবশ্যই আমি কোন ওযর পেশ করে তার ক্রোধ থেকে বেঁচে যেতাম। কারণ আমাকে তর্কের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আল্লাহর কসম! আমার বিশ্বাস, আজ যদি আমি মিথ্যা কথা বলে আপনাকে আমার প্রতি রাযী করে নেই, তবে অচিরেই আল্লাহ তা*আলা আপনাকে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট করে দিবেন। আর যদি আমি সত্য কথা বলি এবং এতে আপনি আমার প্রতি অসন্তষ্ট হন, তবে এতে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি কল্যাণজনক পরিণামের আশা রাখি। আল্লাহর কসম! আমার কোন ওযর ছিল না। আল্লাহর কসম! আপনার (অভিযান) থেকে পিছনে থাকার সময়ের তুলনায় কোন সময় আমি অধিক ক্ষমতা সম্পন্ন ও অধিক প্রাচুর্যের অধিকারী ছিলাম না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ অবশ্যই এ ব্যক্তি সত্য কথা বলেছে। তারপর তিনি বললেনঃ তুমি চলে হলও, যতক্ষননা আল্লাহ তোমার সমন্ধে ফয়সালা দেন। তারপর আমি উঠে গেলাম। তখন বনূ সালমা গোত্রের কতিপয় লোক দৌড়িয়ে আমার কাছে এসে বলল, আল্লাহর কসম! আমরা তো ইতোপূর্বে তোমাকে আর কোন অন্যায় করতে দেখিনি। যারা পশ্চাতে রয়ে গিয়েছিল, তারা যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ওযর পেশ করেছে সেভাবে ওযর পেশ করতে কি তুমি অপারগ ছিলে? অতএব, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইস্তিগফারই তোমার গুনাহের জন্য যথেষ্ট হতো। তিনি বলেন, আল্লাহর কসম। এভাবে তারা আমাকে এত ভৎসনা করতে লাগল যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আবার গিয়ে আমার নিজের উক্তি মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ইচ্ছা হতে লাগল। আমি লোকদের বললাম, আমার মত আর কারো এমন অবস্থা হয়েছে কি? তারা বলল, হ্যাঁ, আরো দুই জন তোমার মত করেছেন। তুমি যা বলেছ তারাও অনুরূপ বলেছেন এবং তোমাকে যা বলা হয়েছে তাদেরও তাই বলা হয়েছে। আমি বললাম, তারা কারা? তারা বলল, তারা হলেন, মুররা ইবনু রাবীআ আমিরী এবং হেলাল ইবনু উমায়্যা ওয়াকিফী (রাঃ)। কা’ব বলেন, তারা আমার নিকট এমন দুই ব্যক্তির কথা উল্লেখ করল, যারা ছিলেন নেককার, বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী। ঐরা দুইজনই ছিলেন অনুসরণযোগ্য। কা’ব (রাঃ) বলেন, যখন তারা ঐ দুই ব্যক্তির কথা উল্লেখ করল, তখন আমি চলে গেলাম। এদিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যারা যুদ্বে অংশগ্রহণ করেনি তাদের মধ্য থেকে শুধু আমাদের তিন জনের সাথে মুসলিমদের কথা বলতে নিষেধ করে দিলেন। এরপর লোকেরা আমাদের পরিহার করল অথবা বলেছেন, আমাদের সাথে তাদের ব্যবহার বদলে গেল। এমনকি যমীনও যেন পরিবর্তিত হয়ে গেল, (মনে হল) যে ভূমি আমি চিনতাম, এ যেন তা নেই। এমনি করে পঞ্চাশ রাত্র কাটালাম। আর আমার দুই সাথী ছিলেন হীনবল, তাই তারা নিজ নিজ ঘরে চুপচাপ বসে রইলেন এবং কাঁদতে লাগলেন। আর আমি তাদের মধ্যে কম বয়স্ক ও সবল ছিলাম। আমি রাস্তায় বের হতাম, সালাতে শরীক হতাম এবং বাজারেও ঘোরাফেরা করতাম। কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে কোন কথা বলতো না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত আদায়ের পর নিজ স্থানে বসা ছিলেন, এমতাবস্থায় আমি তার নিকট এলাম, তাকে সালাম করলাম এবং মনে মনে ভাবলাম, তিনি সালামের জওয়াব প্রদান করে তার ওষ্ঠযুগল নাড়িয়েছেন কি না? তারপর আমি তাঁর নিকটে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করলাম এবং গোপন চাহনির মাধ্যমে আমি তার দিকে তাকালাম। যখন আমি সালাতে মশগুল হতাম তখন তিনি আমার প্রতি নযর দেন। কিস্তু আমি যখন তার দিকে তাকাই তখন তিনি আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। আমার প্রতি মুসলিমদের এ কঠোর আচরণ যখন দীর্ঘায়িত হয়ে গেল তখন আমি গিয়ে আবূ কাতাদা (রাঃ) এর বাগানের প্রাচীরের উপর উঠলাম। তিনি ছিলেন আমার চাচাতো ভাই এবং আমার অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তি। উপরে উঠেই আমি তাঁকে সালাম করলাম। কিন্তু আল্লাহর কসম! তিনি আমার সালামের কোন উত্তর দিলেন না। আমি তাঁকে বললাম, হে আবূ কাতাদা! আমি তোমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করছি, তুমি কি জান না যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ভালবাসি? তিনি কোন উত্তর দিলেন না। আমি পুনরায় তাঁকে কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। এবারও তিনি কোন উত্তর দিলেন না। তারপর আবারো আমি তাঁকে কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। উত্তরে তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ই ভাল জানেন। এ কথা শুনে আমার দু’নয়ন দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। অবশেষে পিছন ফিরে আমি আবার দেয়ালের উপর চড়লাম। তারপর আমি কোন একদিন মদীনার বাজার দিয়ে যাচ্ছিলাম, এ সময় মদীনার বাজারে শাক-সবজি বিক্রির উদ্দেশ্যে আগত সিরিয়ার কৃষকদের মধ্য থেকে একজন বলতে লাগল, আমাকে কা’ব ইবনু মালিকের ঠিকানা বলতে পারে এমন কোন ব্যক্তি আছে কি? লোকেরা ইশারায় আমাকে দেখিয়ে দিলে সে আমার নিকট আসল এবং গাসশান সম্রাটের পক্ষ হতে আমাকে একটি পত্র দিল। আমি লেখাপড়া জানতাম। তাই আমি তা পাঠ করলাম। এতে লেখা ছিল, আমি জানতে পারলাম যে, তোমার সঙ্গী মুহাম্মাদ তোমার প্রতি যুলুম করয়ে অথচ আল্লাহ পাক তোমাকে নীচু ঘরে জন্য দেননি এবং ধ্বংসের স্থানেও নয়। সুতরাং তুমি আমাদের নিকট চলে এসো। আমরা তোমার সহযোগিতা করবো। এ পত্র পাঠমাত্র আমি বললাম এও আরেক ধরনের পরীক্ষা। তখন এ পত্রটি নিয়ে আমি উনানের নিকট গেলাম এবং উহা আগুনে জ্বালিয়ে দিলাম। চল্লিশ দিন অতিবাহিত হল। কিন্তু এদিকে কোন ওহী আসছে না। এমতাবস্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এক বার্তাবাহক আমার নিকট এসে বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে তোমার স্ত্রী হতে দূর হয়ে যাবার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কি তাকে তালাক দিয়ে দিব, না অন্য কিছু করব? তিনি বললেন, না তালাক দিতে হবে না। বরং তুমি তার থেকে পৃথক হয়ে যাও এবং তার সাথে সহবাস করো না। তিনি বলেন, আমার অন্য দুই সঙ্গীদের নিকটও অনুরূপ বার্তা প্রেরণ করা হল। কা’ব (রাঃ) বলেন, অতঃপর আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, তুমি তোমার পিতার বাড়ী চলে যাও এবং যে পর্যন্ত আল্লাহ পাক এ সম্পর্কে কোন ফয়সালা না করেন ততদিন সেখানেই অবস্থান করবে। কাব (রাঃ) বলেন, তারপর হিলাল ইবনু উমায়্যা (রাঃ) এর স্ত্রী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! হিলাল ইবনু উমায়্যা একজন বৃদ্ধ-অকেজো ব্যক্তি। তার কোন খাদিম নেই। যদি আমি তার খিদমত করি, আপনি কি তা অপছন্দ করেন? তিনি বললেন, না, তবে সে তোমার সাথে সহবাস করতে পারবে না। এ কথা শুনে হিলাল (রাঃ) এর স্ত্রী বললেন, আল্লাহর কসম! (কোন ব্যাপারেই) তার মনে কোন স্পন্দন নেই এবং আল্লাহর কসম! ঐ ঘটনার পর থেকে অদ্যাবধি সে কেঁদেই দিনাতিপাত করছে। তিনি বলেন, আমার পরিবারের কেউ কেউ বললেন, আচ্ছা তুমিও যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে অনুমতি নিয়ে নিতে। তিনি তো হিলাল ইবনু উমায়্যার স্ত্রীকে তার স্বামীর খিদমতের অনুমতি দিয়েছেন। কা’ব বলেন, আমি বললাম, আমি আমার স্ত্রীর ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করব না। কারণ আমি যুবক মানুষ। আমি আমার স্ত্রীর ব্যাপারে অনুমতি প্রার্থনা করলে না জানি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বলেন। এ অবস্থায় আরো দশ রাত কাটালাম। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন থেকে আমাদের সাথে কথাবার্তা বলতে নিষেধ করেছিলেন, তখন থেকে আমাদের পঞ্চাশ রাত পূর্ণ হয়। কাব বলেন, পঞ্চাশতম রাতের ফজরের সালাত আমি আমারর গৃহের ছাদের উপর আদায় করলাম। এরপর যখন আমি ঐ অবস্থায় বসা ছিলাম, যা আল্লাহ আমাদের ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন, অর্থাৎ আমার জীবন আমার জন্য সংকটাপন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং পৃথিবীপ্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও আমার কাছে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তখন আমি একজন ঘোষণাকারীর আওয়াজ শুনলাম, যিনি সালা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে উচ্চস্বরে বলছেন, হে কাব ইবনু মালিক! সুসংবাদ গ্রহন কর। কা’ব বলেন, তখন আমি সিজদায় লুটিয়ে পড়লাম এবং আমি বুঝতে পারলাম যে, সংকট মুক্তি এসে গেছে। কা’ব বলেন, এদিকে ফজরের সালাতের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের কাছে ঘোষণা করলেন যে, আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওবা কবুল করেছেন। তখনই লোকেরা আমাদের সুসংবাদ দেয়ার জন্য ছুটে চলল এবং আমার সাথীদ্বয়কে খোশখবরী পৌছানৌর জন্য কয়েকজন লোক তাদের নিকট গেলেন। আর আমার দিকে একজন ঘোড়ার উপর সাওয়ার হয়ে রওনা হলেন এবং আসলাম গোত্রের আর এক ব্যক্তিও রওনা হলেন। তিনি পাহাড়ের উপর আরোহণ করে ঘোষণা দিলেন। অশ্বের চেয়েও আওয়াজের গতি আরোদ্রুত এর তারপর যার সুসংবাদের আওয়াজ আমি শুনেছিলাম তিনি আমার নিকট আসলে আমি আমার পরিধেয় বস্ত্র দু’টো সুসংবাদের পুরস্কার স্বরূপ তাকে দিয়ে দিলাম। আল্লাহর কসম! সেদিন ঐ দু’টো কাপড় ব্যতীত আমি আর কোন কাপড়ের মালিক ছিলাম না। অতএব আমি দু’টো কাপড় ধার নিয়ে পরিধান করলাম। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আমি রওনা দিলাম। আমার তাওবা কবুলের মুবারকবাদ জানানোর জন্য লোকেরা দলে দলে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে লাগল এবং বলতে লাগল, আল্লাহর ক্ষমা তোমার জন্য মূবারক হোক। এমতাবস্থায় আমি মসজিদে প্রবেশ করে দেখলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদেই উপবিষ্ট আছেন এবং তাঁর পাশে লোকজন রয়েছে। তখন তালহা ইবনু উবায়দুল্লাহ (রাঃ) দাঁড়ালেন এবং দৌড়ে এসে আমার সাথে মুসাফাহা করলেন এবং তিনি আমাকে মুবারকবাদ জানালেন। আল্লাহর কসম! মুহাজিরদের মধ্যে তখন তিনি ছাড়া আর কেউ (আমাকে দেখে) দাঁড়াননি। রাবী বলেন, কা’ব তালহার এ সদাচরণের কথা ভুলেননি। কাব ইবনু মালিক (রাঃ) বলেন, তারপর আমি যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সালাম করলাম তখন তাঁর চেহারা খুশীতে চমকাতে ছিলো। তিনি বললেন, তোমার মা তোমাকে জন্ম দেয়ার পর থেকে যতদিন অতিবাহিত হয়েছে, তার মধ্যে তোমার জন্য এ মুবারক দিনটির সুসংবাদ। কা’ব (রাঃ) বলেন, আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তা কি আপনার পক্ষ থেকে, ইয়া রাসুলাল্লাহ! না মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। তিনি বললেন, না, বরং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খুশী হতেন, তখন তাঁর চেহারা মুনারক এমনভাবে প্রদীপ্ত হতো যেন তা এক খণ্ড চাঁদ। কা’ব (রাঃ) বলেন, আমরা তাঁর চেহারা দেখেই তা বুঝতে পারতাম। তিনি বলেন, আমি যখন তাঁর সামনে বসলাম তখন বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার তাওবার শুকরিয়া হিসেবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য সাদাকা স্বরূপ দান করে আমার সমস্ত মাল থেকে মুক্ত হতে চাই। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কিছু মাল তোমার নিজের জন্য রেখে দাও। এই তোমার জন্য উত্তম। আমি বললাম, তাহলে আমি খায়বরে প্রাপ্ত অংশটুকু রেখে দিব। কা’ব (রাঃ) বলেন, এরপর আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সত্য কথাই আমাকে মুক্তি দিয়েছে; তাই যতদিন জীবিত থাকি আমি সত্য ছাড়া বলবনা। তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে সে সত্য কথা বলার পর, আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি যে অনুগ্রহ প্রদর্শন করেছেন; আল্লাহ তায়াআলা আর কোন মুসলিম ব্যক্তির প্রতি এরূপ করেছেন বলে আমি জানিনা। আল্লাহর কসম! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে এ আলোচনা করার পর অদ্যাবধি ইচ্ছাকৃতভাবে আমি কখনো মিথ্যা কথা বলিনি। আমার আশা, অবশিষ্ট জীবনেও আল্লাহ তাআলা আমাকে মিথ্যা থেকে বাঁচিয়ে রাখবেন। কা’ব (রাঃ) বলেন, আমার তাওবা গ্রহণযোগ্য হবার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা তখন নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেছিলেনঃ “আল্লাহ অনুগ্রহপরায়ণ হলেন নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যারা তার অনুগমন করেছিলো সংকটকালে, এমনকি যখন তাদের এক দলের চিত্ত-বৈকল্যের উপক্রম হয়েছিলো। পরে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করলেন। তিনি তাদের প্রতি দয়ার্দ্র পরম দয়ালু এবং তিনি ক্ষমা করলেন অপর তিনজনকেও, যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল, যে পর্যন্ত না পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য উহা সংকুচিত হয়েছিলো এবং তাদের জীবন তাদের জন্য দুর্বিষহ হয়েছিলো এবং তারা উপলব্ধি করেছিল যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন আশ্রয়স্থল নেই। পরে তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ হলেন, যাতে তারা তাওবা করে। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও। (সূরা তাওবাঃ ১১৭-১১৯) কাব (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট সেদিন সত্য কথা বলার কারণে আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন, অনুরূপ অনুগ্রহ ইসলাম গ্রহণের পর আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি আর কখনো করেননি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট সেদিন আমি মিথ্যা বলিনি। যদি বলতাম তবে অবশ্যই আমি ধ্বংস হয়ে যেতাম, যেমন ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। মিথ্যাবাদীগণ। ওহী অবতরণ কালে আল্লাহ মিথ্যাবাদীদের এমন কঠোর সমালোচনা করেছেন, যা আর কাউকে করেননি। তিনি বলেছেনঃ তোমরা তাদের নিকট ফিরে এলে তারা আল্লাহর শপথ করবে, যেন তোমরা তাদের উপেক্ষা কর সুতরাং তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা করবে তারা অপবিত্র, তাদের কৃতকর্মের ফল স্বরূপ জাহান্নাম তাদের আবাস স্থল। তারা তোমাদের নিকট হলফ করবে যাতে তোমরা তাদের প্রতি তুষ্ট হও। তোমরা তাদের প্রতি তুষ্ট হলেও আল্লাহ ফাসিক (সত্যত্যাগী) লোকদের প্রতি তুষ্ট হবেন না। (সূরা তাওবাঃ ৯৫ ও ৯৬) কা’ব (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট শপথ করার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদের ওযর গ্রহণ করেছিলেন, যাদের বায়আত করেছিলেন এবং যাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন তাদের থেকে আমাদের তিনজনের বিষয়টিকে বিলম্বিত করা হয়েছিল। আল্লাহর পক্ষ থেকে ফয়সালা আসা পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বিষয়টিকে স্থগিত রেখেছিলেন। তাই আল কুরআনে আল্লাহ তায়াআলা বলেছেনঃ আর তিনি ক্ষমা করলেন অপর তিনজনকেও যাদের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল। এখানেخلفوا “যুদ্ধ হতে আমাদের পেছনে থাকা” নয়। বরং এর অর্থ হচ্ছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক “আমাদের বিষয়টিকে স্থগিত রাখা।” ঐ লোকদের বিপরীতে যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সান্মুখে শপথ করেছিল এবং ওযর পেশ করেছিলো অতঃপর তিনি তা কবুল করেছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনু রাফি (রহঃ) ... ইবনু শিহাব (রহঃ) এর সুত্রে যুহরী (রহঃ) এর সুত্রে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন।