Alhashorহাদীস সম্ভার
মু

মুসলিম শরীফ - হাদীস নং ৬,৭৬৩

প্রায় ১৭ মিনিট · ২,৪২৯ শব্দ

হিব্বান ইবনু মূসা, ইসহাক ইবনু ইবরাহীম আল-হানযালী, মুহাম্মদ ইবনু রাফি ও আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) সাঈদ ইবনু মূসায়্যাব, উরওয়া ইবনু যুবায়র, আলকামা ইবনু ওয়াক্কাস এবং উবায়দুল্লাহ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু উতবা ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তাঁরা সকলেই আয়িশা (রাঃ) এর ঐ ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন, অপবাদ রটনাকারীরা তাঁর ব্যাপারে যে অপবাদ রটনা করে বলোছিল। তারপর রটানো অপবাদ থেকে আল্লাহ তাকে নির্দোষ ঘোষণা করলেন। বর্ণনাকারী যুহরী (রহঃ) বলেন, তারা সকলেই আমার নিকট হাদীসের এক এক অংশ বর্ণনা করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ অন্যের তুলনায় উক্ত হাদীসের সুদৃঢ় হাফিয ছিলেন এবং তা উত্তমরূপে বর্ণনা করতে সক্ষম ছিলেন। তারা আমার নিকট যা বর্ণনা করেছেন, তাদের প্রত্যেকের বর্ণনা আমি যথাযথভাবে মুখস্থ করে রেখেছি। একের হাদীস অন্যের হাদীসকে সত্যায়ন করে। তারা সকলেই আলোচনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিনা আয়িশা সিদ্দীকা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফরে যাওয়ার ইচ্ছা করতেন তখন তিনি তাঁর স্ত্রীদের মাঝে লটারী দিতেন। যার নাম আসত তাকেই তিনি তাঁর সঙ্গে সফরে নিতেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এক যুদ্ধ-সফরের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লটারী দিলেন এবং এতে আমার নাম উঠল। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে সে যুদ্ধে অংশ গ্রহন করি। পর্দার হুকুম নাযিল হবার পর এ যুদ্ধে আমি অংশ গ্রহন করেছিলাম। সাওয়ারী অবস্থায় আমি হাওদার ভিতরে থাকতাম এবং অবতরণ কালেও হাওদার ভিতর থাকতাম। পরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধ থেকে অব্যাহতির পর প্রত্যাবর্তন করে মদীনার নিকটবর্তী স্থানে পৌছার পর এক রাত্রে তিনি রওয়ানা হবার নির্দেশ দিলেন। লোকজন যখন রওয়ানা হবার ব্যাপারে ঘোষণা দিল, তখন আমি পথ চলতে লাগলাম; এমনকি আমি সৈন্যদেরকে ছাড়িয়ে চলে গেলাম। এরপর আমি প্রাকৃতিক প্রয়োজন (প্রস্রাব পায়খানা) সেরে সাওয়ারীর নিকট এলাম এবং স্বীয় বুকে হাত দিয়ে দেখলাম, যিফারী পুতির তৈরী আমার হারটি হারিয়ে গিয়েছে। তাই পূর্বস্থানে ফিরে গিয়ে আমি আমার হারটি তালাশ করলাম। এতে আমার বিলম্ব হয়ে গেল। এদিকে হাওদা বহনকারী লোকজন এসে হাওদা উঠিয়ে আমায় বহনকারী উটের উপর রেখে দিল। তারা মনে করেছিল আমি হাওদার ভিতরেই আছি। আয়িশা (রাঃ) বলেন, তখনকার মহিলারা হালকা-পাতলা গড়নেরই হতো। না অধিক ভারী, না অধিক মোটা। কারণ তারা কম খাবার খেত। তাই উত্তোলনকালে হাওদার ওযন তাদের নিকট সাধারণ অবস্থা থেকে ব্যতিক্রম মনে হয়নি। অধিকন্তু তখন আমি অল্প বয়স্কা ছিলাম। অবশেষে লোকেরা উট দাঁড় করিয়ে পথ চলতে আরম্ভ করে দিল। সৈন্যদের রওয়ানা হয়ে যাবার পর আমি আমার হার পেলাম। তারপর আমি পূর্ববর্তী স্থানে ফিরে এসে দেখলাম, তথায় কোন জন-মানুষের আওয়াজ নেই আর সাড়া দেওয়ার মত কোন ব্যক্তিও তথায় নেই। তখন আমি ইচ্ছা করলাম, আমি যেখানে বসা ছিলাম সেখনেই বসে থাকব এবং আমি ভাবলাম, লোকেরা যখন খুঁজে আমাকে পাবে না তখন অবশ্যই তারা আমার সন্ধানে আমার নিকট ফিরে আসবে। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি আমার জায়গায়, উপবিষ্ট অবস্থায় আমার ঘুম এল আর আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। সাফওয়ান ইবনু মুয়াত্তাল আস-সুলামী আয যাকওয়ানী (রাঃ) নামক এক ব্যক্তি ছিল। (বিশেষ দায়িত্ব পালনে সে) সৈন্যদের পেছনে শেষ রাত্রে সে আগের জায়গায়ই রয়ে গিয়েছিল। পরে সে রওয়ানা হয়ে প্রত্যুষে আমার স্থানে পৌছল। দূর থেকে সে একটি মানব দেহ দেখতে পেয়ে আমার নিকট এলেন এবং আমাকে দেখে সে চিনে ফেলল। কেননা পর্দার হুকুম নাযিল হওযার পূর্বে সে আমাকে দেখেছিল। আমাকে চিনে সে “ইন্না লিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিঊন” পড়লে তাঁর ইন্না লিল্লাহ এর আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। তৎক্ষনাৎ আমি আমার চাদর দিয়ে স্বীয় মুখমন্ডল আবৃত করে নিলাম। আল্লাহর কসম! সে আমার সাথে কোন কথা বলেনি এবং “ইন্না লিল্লাহ” ... পাঠ ছাড়া তার কোন কথাই আমি শুনিনি। তারপর সে তার উট বসিয়ে স্বীয় হস্ত বিছিয়ে দিলে আমি তার উটের পৃষ্ঠে উঠলাম। আর সে পায়ে হেঁটে আমাকে সহ উট হাকিয়ে চলল। যেতে যেতে আমরা সৈন্য দলের নিকট গিয়ে পৌছলাম। তখন তারা দ্বিপ্রহরের প্রচণ্ড রোদের মাঝে সাওয়ারী থেকে অবতরণ করে ভূমিতে অবস্থান করছিল। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমার বিষয়ে যারা ধ্বংস হবার তারা ধ্বংস হয়ে গেল। এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সাহল। অবশেষে আমরা মদীনায় পৌছলাম। মদীনায় পৌছার পর এক মাস পর্যন্ত আমি অসুস্থ ছিলাম। এদিকে মদীনার লোকজন অপবাদ রটনাকারীদের কথা গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখতে লাগল। এ সম্পর্কে আমি কিছুই জানতে পারিনি। তবে এ রুগ্ন অবস্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে পূর্বের ন্যায় স্নেহ না পাওয়ার ফলে আমার মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গৃহে প্রবেশ করে কেবল সালাম করে বলতেন, তোমাদের সে (আয়শা) কেমন আছে? এ আচরণ আমাকে সন্দিহান করে তুলল। আমি সে (মন্দ) বিষয়টি সমন্ধে জানতাম না। তারপর রোগ মুক্ত হবার পর আমি বের হলাম। আমার সাথে মিসতাহ এর আম্মাও ’মানাসি’ প্রান্তরের দিকে বের হল। সেটি ছিল আমাদের শৌচাগার। আমরা রাত্রে বের হতাম এবং রাত্রেই চলে আসতাম। এ হল আমাদের ঘরের কাছে শৌচাগর নির্মাণের পূর্ববর্তী সময়ের ঘটনা। তখন আগের দিনের আরব লোকদের মত ময়দানে গিয়ে আমরা শৌচকার্য সারতাম। আর আমরা ঘরের কাছে শৌচাগার নির্মাণ করা অপছন্দ করতাম। আমি এবং মিসতাহ-এর আম্মা যেতে লাগলাম। সে ছিল আবূ রুহম ইবনু মুত্তালিব ইবনু আবদ মানাফের কন্যা এবং তার মা ছিলেন আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) এর খালা সাখর ইবনু আমির এর কন্যা। তার সন্তানের নাম ছিল মিসতাহ ইবনু উসাসা ইবনু আব্বাদ ইবনু মুত্তালিব। মোটকথা, আমি ও বিনতি আবূ রুহম (মিসতাহ এর আম্মা।) নিজ নিজ শৌচকার্য সেরে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলাম। এমন সময় মিসতাহ এর আম্মা নিজ চাঁদরে পেঁচ খেয়ে হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়। আর সে বলে উঠে মিসতাহ ধ্বংস হোক। তখন আমি বললাম, তুমি অন্যায় কথা বলেছ। তুমি কি বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী ব্যক্তিকে মন্দ বকছ? সে বলল, হে অবলা নারী! মিসতাহ কি বলেছে তুমি কি শোননি? আমি বললাম, সে কি বলেছে? আয়িশা (রাঃ) বলেন, তারপর সে অপবাদ রটনাকারীরা কি বলেছে, সে সম্পর্কে আমাকে সংবাদ দিল। এতে আমার রোগ কয়েক গুন বেড়ে গেল। আমি যখন বাড়ীতে ফিরে এলাম, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার গৃহে প্রবেশ করে আমাকে সালাম করলেন এবং বললেন, সে কেমন আছে? তখন আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি আমাকে আমার বাবা-মায়ের বাড়ীতে যাওয়ার অনুমতি দিবেন? আয়িশা (রাঃ) বলেন, তখন আমি আমার বাবা-মায়ের বাড়ী গিয়ে এ বিষয়টির অনুসন্ধান করার ইচ্ছা করেছিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে অনুমতি দিলেন। আমি আমার মাতা-পিতার নিকট চলে এলাম। তারপর আমি আমার আম্মাকে বললাম, আব্বা জান! লোকেরা কী কথা বলছে? তিনি বললেন, মা! (এদিকে কান দিয়োনা এবং) নিজের জন্য সহজভাবে গ্রহন কর (শান্ত থাক)। আল্লাহর কসম! কারো যদি কোন সুন্দরী স্ত্রী থাকে ও সে তাকে ভালবাসে আর ঐ মহিলার কোন সতীনও থাকে তবে সতীনরা তার দোষচর্চা করবেনা এরুপ খুব কমই হয়। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এ কথা শুনে আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ! লোকেরা এ কথা রটাতে আরম্ভ করেছে? তারপর কেঁদে কেঁদে আমি সারা রাত্র কাটালাম। এমনকি ভোরেও আমার অশ্রু বন্ধ হলো না। আমি ঘুমোতে পারিনি। সকালেও আমি কাঁদছিলাম। এদিকে আমাকে তালাক দেয়ার ব্যাপারে পরামর্শ করার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) এবং উসামা ইবনু যায়িদ (রাঃ) কে ডাকলেন। তখন ওয়াহী স্থগিত ছিল। তিনি বলেন, উসামা ইবনু যায়িদ (রাঃ) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিবীদের সতীত্ব এবং তাদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভালবাসা সম্পর্কে যা জানতেন সে দিকেই তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ইঙ্গিত দিলেন। তিনি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আয়িশা আপনার স্ত্রী, ভাল ব্যতীত তাঁর সমন্ধে কোন কথাই আমাদের জানা নেই। আর আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) বললেন, আল্লাহ তো আপনার উপর কোন সংকীর্ণতা চাপিয়ে দেননি। সর্বোপরি আয়িশা (রাঃ) ছাড়াও বহু স্ত্রীলোক আছে। আপনি যদি দাসী (বারীরা) কে জিজ্ঞাসা করেন তবে সে সত্য বলে দিবে। আয়িশা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারীরা (রাঃ) কে ডেকে বললেন, হে বারীরা! সন্দেহমূলক কোন কাজে আয়িশাকে তুমি কখনো দেখেছ কি? বারীরা (রাঃ) তাঁকে বললেন, ঐ সত্তার শপথ! যিনি আপনাকে সত্য পয়গাম্বর হিসাবে প্রেরণ করেছেন, আমি যদি তার মাঝে কোন কিছু দেখতাম তবে অবশ্যই এর দোষ আমি বর্ণনা করতাম। তবে সে একজন অল্প বয়স্কা মেয়ে। পরিবারের জন্য আটার খামীর রেখেই সে ঘুমিয়ে পড়তো আর বকরী এসে তা খেয়ে ফেলতো। এ দোষ ব্যতীত অধিক কোন দোষ আয়িশার মধ্যে আছে বলে আমার জানা নেই। তিনি বলেন, অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরে দাঁড়িয়ে আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সালূল এর আচরনের ব্যাপারে কে আমাকে সহায়তা করবে এবং শাস্তি দিলে কে আমাকে সমর্থন করবে......। তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে বললেন, হে মুসলিম সম্প্রদায়! আমার পরিবার সম্পর্কে যে ব্যক্তির পক্ষ থেকে কষ্টদায়ক কথা পৌঁছেছে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করার ব্যপারে কে আমাকে সহায়তা (সহায়তা) করবে? আমি তো (তদন্ত করে) আমার পরিবার সম্পর্কে ভাল ব্যতীত অন্য কোন কথা জানি নি এবং যে ব্যক্তি সম্পর্কে তারা অপবাদ রটনা করছে তাকেও আমি নেক্‌বকার বলেই জানি। সে তো আমার সঙ্গ ব্যতীত আমার গৃহে কখনো প্রবেশ করতো না। এ কথা শুনে সা’ন ইবনু মু’আয আনসারী (রাঃ) দাঁড়ালেন এবং বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি আপনার পক্ষ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করব। অপবাদ রটনাকারী ব্যক্তি যদি আউস গোত্রের হয় তবে আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেব। আর যদি সে আমাদের ভ্রাতা খাযরাজ গোত্রের হয় তবে আপনি আমাদের নির্দেশ দিন। আমরা আপনার নির্দেশ পালন করব। আয়িশা (রাঃ) বলেন, তখন খাযরাজ সর্দার সা’দ ইবনু উবাদা (রাঃ) দাঁড়ালেন। তিনি একজন নেককার লোক ছিলেন। তবে তখন বংশীয় অহমিকা তাকে ক্রোধে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। তাই তিনি সা’দ ইবনু মু’আয কে বললেন, আল্লাহর কসম! তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি তাকে হত্যা করো না। তুমি তাকে হত্যা করতে পারবেনা। একথা শুনে সা’দ ইবনু মুআয (রাঃ) এর চাচাতো ভাই উসায়দ ইবনু হুযায়র (রাঃ) দাঁড়িয়ে সা’দ ইবনু উবাদা (রাঃ) কে বললেন, তুমি মিথ্যা বলছো। আল্লাহর কসম! আমরা অবশ্যই তাকে হত্যা করব। অবশ্যই তুমি মুনাফিক। তাই মুনাফিকদের পক্ষে কথা বলছো। এ সময় আউস ও খাযরাজ উভয় গোত্রের লোকেরা পরস্পর উত্তেজিত হয়ে উঠল। এমনকি তারা যুদ্ধের সংকল্প করে বসলো। অথচ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তখনও তাদের সামনে মিম্বরে দাঁড়ানো অবস্থায় ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদেরকে থামিয়ে শান্ত করলেন। তারা চুপ হলো এবং তিনি নিজেও আর কোন কথা বললেন না। আয়িশা (রাঃ) বলেন, সেদিন আমি সারাক্ষণ কেঁদে কাটালাম। অবিরত ধারায় আমার অশ্রুপাত হচ্ছিল। রাত্রে একটুও আমার ঘুম আসল না। অতঃপর রাতেও আমি কেঁদে কাটালাম। এরাতেও অবিরত আমার অশ্রুপাত হল এবং একটুকুও ঘুমাতে পারলাম না। এ দেখে আমার আব্বা-আম্মা মনে করছিলেন যে, কান্নায় আমার হৃদপিন্ড বিদীর্ন হয়ে যাবে। আমি ক্রন্দনরত ছিলাম, আমার আব্বা-আম্মা আমার পাশে উপবিষ্ট ছিলেন। এমতাবস্থায় একজন আনসার স্ত্রীলোক আমার নিকট আসার অনুমতি চাইলে আমি তাকে অনুমতি দিলাম। সে এসে বসে কাঁদতে লাগল। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমাদের যখন এ অবস্থা এমন সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট প্রবেশ করলেন এবং আমাদেরকে সালাম করে বসলেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, অথচ আমার সমন্ধে যা বলাবলি হচ্ছে তারপর থেকে তিনি আমার কাছে বসেননি। এভাবে এক মাস চলে গেল। আমার বিষয়ে তার নিকট কোন ওহী এল না। আয়িশা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে তাশাহুদ পাঠ করলেন। তারপর বললেন, যা হোক হে আয়িশা! তোমার সম্পর্কে আমার নিকট এমন এমন সংবাদ পৌছেছে। যদি তুমি এ ব্যাপারে নিষ্পাপ এবং পবিত্র হও তবে আল্লাহ তাআলা তোমার পবিত্রতার ব্যাপারে ঘোষণা করবেন। আর যদি তোমার দ্বারা কোন গুনাহ হয়ে থাকে তবে তুমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা এবং তাওবা কর। কেননা বান্দা গুনাহ স্বীকার করে তাওবা করলে আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তার কথা শেষ করলেন, তখন আমার অশ্রুপাত বন্ধ হয়ে গেল। এমনকি এরপর আর এক ফোটা অশ্রুও আমি অনুভব করলাম না। এরপর আমি আমার পিতাকে বললাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বললেন, আমার পক্ষ থেকে তার জবাব দিন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কি জবাব দিব, আমি তা জানি না। তারপর আমি আমার আম্মাকে বললাম, আমার পক্ষ থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জবাব দিন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কি জবাব দিব, আমি তা জানি না। আমি বললাম, তখন আমি ছিলাম অল্প বয়স্কা কিশোরী। কুরআন শরীফও খুব বেশী পড়িনি। এ অবস্থা দেখে আমিই তখন বললাম, আল্লাহর কসম! আমি জানি, আপনারা এ অপবাদের কথা শুনেছেন, মনে তা গেঁখে গিয়েছে এবং আপনারা তা বিশ্বাস করে নিয়েছেন। সুতরাং এখন যদি আমি বলি, আমি নিষ্কলুষ তবে এ বিষয়ে আপনারা আমাকে বিশ্বাস করবেন না। আর যদি আমি স্বীকার করি, যে সম্পর্কে আল্লাহ জানেন যে, আমি নিস্পাপ, তবে আপনারা তা বিশ্বাস করবেন। আল্লাহর কসম! আমার ও আপনাদের জন্য (নবী) ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) এর পিতার কথার উদাহরণ ব্যতীত অন্য কোন উদাহরণ আমি খুজে পাচ্ছি না। তিনি বলেছিলেন, “সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা যা বলছো সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার আশ্রয়স্থল।” এ কথা বলে আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম এবং বিছানায় শুয়ে পড়লাম। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! আল্লাহ তো ঐ মুহুর্তেও জানেন যে, আমি অবশ্যই নিষ্পাপ এবং অবশ্যই আল্লাহ তাআলা আমার পবিত্রতা প্রকাশ করে দিবেন। তবে আল্লাহর কসম! আমি ধারণা করিনিম যে, আল্লাহ আমার এ বিষয়ে ওয়াহী নাযিল করবেন, যা পঠিত হবে। কেননাআল্লাহ কর্তৃক আমার সমন্ধে পঠিত হবার মত কোন আয়াত নাযিল করবেন আমার নিজের কাছে আমার অবস্থা এর চেয়ে তুচ্ছতর ছিল। তবে আমি আশা করেছিলাম যে, স্বপ্নের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এমন কোন বিষয় দেখানো হবে যার দ্বারা আল্লাহ তা’আলা আমার পবিত্রতা জানিয়ে দিবেন। আয়িশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনো তাঁর স্থান ছেড়ে উঠেননি এবং বাড়ীর লোকও কেউ বাইরে যায়নি। এ সময় আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবীর উপর ওয়াহী নাযিল করেন। ওয়াহী নাযিলের সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর যে কষ্টকর অবস্থা দেখা দিত সে অবস্থা দেখা দিলো। এমনকি তার প্রতি নাযিলকৃত বাণীর ওযনের কারণে প্রচণ্ড শীতের দিনেও তার দেহ থেকে মুক্তার মত বিন্দু বিন্দু ঘাম গড়িয়ে পড়তো। আয়িশা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ কষ্টকর অবস্থা চলে গেলে তিনি হাসতে লাগলেন এবং প্রথমে যে কথাটি বললেন তা হলোঃ হে আয়িশা! সুসংবাদ গ্রহণ কর। আল্লাহ তোমার পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন। এ কথা শুনে আমার আম্মা আমাকে বললেন, তুমি উঠে তার (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর কাছে যাও। আমি বললাম, আমি উঠে তার কাছে যাব না এবং আল্লাহ ছাড়া আর কারো প্রশংসা করবো না। তিনই আমার পবিত্রতা সম্পর্কিত আয়াত নাযিল করেছেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আল্লাহ তাআলা আমার পবিত্রতা সম্বন্ধে দশটি আয়াত নাযিল করেছেন। 'যারা অপবাদ রটনা করেছে তারা তো তোমাদেরই একটি দল একে তোমরা তোমাদের জন্য অনিষ্টকর মনে করোনা; বরং এ তো তোমাদের জন্য কল্যাণকর।' (সূরা নুরঃ ১১-২১) ...... আয়িশা (রাঃ) বলেন, আত্নীয় বন্ধন ও দারিদ্র্যের কারণে আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) মিসতাহকে আর্থিক সহযোগিতা করতেন। কিন্ত্বু আয়িশা সম্পর্কে সে যা বলেছিল সে কারণে আবূ বকর (রাঃ) কসম করে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি আর কখনো মিসতাহকে আর্থিক সাহায্য দিবনা। তখন আল্লাহ তায়ালা নাযিল করলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে, তারা দান করবে না আত্মীয় স্বজনকে ... ... ...। তোমরা কি চাওনা যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করেন, পর্যন্ত। হিব্বান ইবনু মূসা (রহঃ) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক (রহঃ) বলেছেন, আল কুরআনের মাঝে এ আয়াত বড়ই আশাব্যঞ্জক। সুতরাং আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই পছন্দ করি যে, আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দিন। এরপর তিনি মিসতাহ (রাঃ) এর জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতেন তা পূনরায় ব্যয় করতে আরম্ভ করলেন। আর বললেন, তাকে আমি এ অর্থ দেওয়া কখনো বন্ধ করবো না। আয়িশা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রী যয়নাব বিনত জাহশ (রাঃ) কে আমার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি যয়নাবকে বলেছিলেন, তুমি আয়িশা সম্পর্কে কি জানো বা দেখেছো? উত্তরে তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি আমার কান ও চোখকে রক্ষা করেছি। আল্লাহর কসম! তাঁর সম্পর্কে আমি ভাল ছাড়া কিছুই জানিনা। আয়িশা (রাঃ) বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সহধর্মিনাদের মধ্যে তিনি সমকক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। কিন্তু আল্লাহ ভীতির দ্বারা আল্লাহ তাকে রক্ষা করেছেন। অথচ তার বোন হামানা বিনত জাহশ তাঁর পক্ষ অবলম্বন করে বিবাদ-বিতণ্ডা করে, আর এভাবে সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের সাথে ধ্বংস হয়ে যায়। রাবী ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন, ঐ লোকদের কাছ থেকে আমার নিকট যা পৌছেছে তা এই হাদীস। তবে রাবী ইউনূসের হাদীসের মধ্যেاجْتَملَتْهُ এর স্থলেاحْتَمَلَتْهُ রয়েছে, গোত্রীয় অহমিকা তাকে উত্তেজিত করে। ,

ছবি বানান