তিরমিযী শরীফ - হাদীস নং ৩,৩১৮
তিনি বলেনঃ (إن تَتُوبَا إِلَى اللَّهِ فَقَدْ صَغَتْ قُلُوبُكُمَا) - যেহেতু তোমাদের হৃদয় ঝুকে পড়েছে তাই তোমরা উভয়ে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে তাওবা কর। তবে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন। (সূরা তাহরীম ৬৬ঃ ৪) আয়াতটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যে দুইজন সহধর্মিণীর উল্লেখ করা হয়েছে। তারা কারা সে সম্পর্কে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু এর নিকট জিজ্ঞাসা করার জন্য আমি অনেক দিন লালায়িত ছিলাম। শেষে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার হজ্জ করতে গেলে আমিও তার সঙ্গে সে হজ্জে ছিলাম। একদিন তিনি উযু করছিলেন আর আমি পাত্র থেকে পানি ঢেলে দিচ্ছিলাম। আমি তাকে বললামঃ হে আমিরুল মুমিণীন! (إن تَتُوبَا إِلَى اللَّهِ فَقَدْ صَغَتْ قُلُوبُكُمَا) আয়াতটিতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যে দুই স্ত্রীর উল্লেখ করা হয়েছে তারা কারা? তিনি বললেনঃ হে ইবন আব্বাস, আশ্চার্য! যুহরী (রহঃ) বলেন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাস্য বিষয়টি পছন্দ করেন নি, তবে তিনি বিষয়টি গোপনও করলেন না। যা হোক তিনি বললেনঃ এরা হল আয়েশা ও হাফসা। এরপর তিনি আমাকে পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করা শুরু করেন। তিনি বলেন আমরা কুরায়শী সম্প্রদায় ছিলাম স্ত্রীদের উপর প্রবল। কিন্তু মদীনায় এসে দেখতে পেলাম যে, এরা এমন এক সম্প্রদায় যাদের উপর তাদের স্ত্রীরা প্রবল। এখানে আমাদের স্ত্রীরাও তাদের আচরণ শিখতে শুরু করে। একদিন একটি বিষয়ে আমার স্ত্রীর উপর আমি রাগ করি। সে তখন আমাকে প্রত্যুত্তর দেয় তার সে প্রত্যুত্তর করাটা আমি অপছন্দ করি। তখন সে বলল আপনি মন্দ ভাবছেন কেন? আল্লাহর কসম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণীরাও তো তার কথার প্রত্যুত্তর করে থাকেন এবং তাদের কেউ কেউ দিন থেকে রাত পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বন্ধ করে রাখেন। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেনঃ আমি মনে মনে বললাম তাদের যে জন এ ধরণের কাজ করে সেত লাঞ্ছিত ও ধ্বংস হয়ে যাবে। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ মদীনায় আওয়ালী অঞ্চলে বানু উমায়্যায় ছিল আমার বাস। আমার এক আনসারী প্রতিবেশী ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে হাযিরী প্রদানের ক্ষেত্রে আমরা পালা নির্ধারণ করে নেই। তিনি এক দিন সেখানে হাজির হতেন এবং সে দিন ওয়াহী ও অন্যান্য বিষয়ের খবরাদি আমার কাছে নিয়ে আসতেন। আরেক দিন আমি হাযির হতাম আর তার কাছে অনুরূপ খবরাদি নিয়ে আসতাম। তখন আমাদের মধ্যে আলোচনা চলছিল যে, গাসসানীরা আমাদেও বিরুদ্ধে লড়ার জন্য অশ্বসমূহে নাল লাগিয়ে তৈরী করে রাখছে। যাহোক আমার ঐ প্রতিবেশী একদিন ইশার সময় আমার বাড়ি আসে এবং দরজায় করাঘাত করে আমি তার কাছে বের হয়ে এলাম। তিনি বললেনঃ একটি ভীষন ব্যাপার ঘটে গেছে। আমি বললাম গাসসানীরাকি এসে গেছে? তিনি বললেন এর চেয়েও ভীষন ব্যাপার। রাসুলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সহধর্মিনীদেরকে তালাক দিয়ে দিয়েছেন। আমি মনে মনে বললাম হাফসা নিরাশ হল এবং ক্ষতিগ্রস্ত হল। আমারো ধারণা ছিল যে,এমন একটি বিষয় কোন দিন ঘটতে পারে। ফজরের সালাত (নামায) আদায় করে আমি কাপোড়-চোপড় পরলাম। রওয়ানা হয়ে হাফসা এর কাছে পৌছলাম। সে তখন কাঁদছিল। আমি বললাম রাসুলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তোমাদের তালাক দিয়ে দিয়েছেন? সে বললঃ আমি জানি না। এই তো তিনি ঐ চিলেকোঠায় আলাদা হয়ে আছেন। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ আমি সে দিকে গেলাম। কৃষ্ণবর্ণের একটি গোলামকে সেখানে পেলাম। বললাম উমারের জন্য অনুমতি প্রার্থনা কর। সে ভেতরে গেল। পরে আমার কছে বের হয়ে এল। বললঃ আপনার কথা তাকে বলেছি কিন্তু কিছুই বললেন না তিনি। আমি মসজিদে চলে এলাম। মিম্বারের চারপাশে বসে কিছু লোক কাঁদছেন। আমি তাদের কাছে বসে গেলাম। কিন্তু পুনঃ আমার মনের উদ্বেগ প্রবল হয়ে উঠল। গোলামটির কাছে এলাম। বললাম উমারের জন্য অনুমতি নিয়ে এস। সে ভেতরে চলে গেল। এরপর আমার কাছে বের হয়ে এসে বললঃ আমি আপনার কথা তার কাছে উল্লেখ করেছি কিন্তু তিনি কিছুই বললেন না। আমি আবার মসজিদে চলে এলাম এবং বসে পড়লাম। পরে আবার আমার ভিতরে উদ্বেগ প্রবল হয়ে উঠল। গোলামটির কাছে এলাম এবং বললাম উমারের জন্য অনুমতি প্রার্থনা কর। সে ভিতরে গিয়ে পুনর্বার বের হয়ে এল। বলল আপনার কথা তো তাকে বললাম কিন্তু তিনি কিছুই বললেন না। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন আমি পিছন ফিরে চলে এলাম। এমন সময় গোলামটি আমাকে ডাকতে লাগল। বললঃ ভিতরে যান, তিনি আপনাকে অনুমতি দিয়েছেন। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলে আমি ভিতরে গেলাম। দেখতে পেলাম রাসুলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি বুননকৃত চাটাইয়ে ঠেস দিয়ে আছেন। চাটাইয়ের দাগ পড়ে গেছে তাঁর দুই পার্শ্বদেশে। আমি বললাম ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনিকি আপনার সহধর্মিণীদের তালাক দিয়েছেন? তিনি বললেনঃ না। আমি বললামঃ আল্লাহু আকবার। ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাদের অবস্থা যদি লক্ষ করতেন যে, আমরা কুরায়শী সম্প্রদায় ছিলাম স্ত্রীদের উপর প্রবল। কিন্তু মদীনায় এসে এমন এক সম্প্রদায় পেলাম যাদের উপর তাদের স্ত্রীরা প্রবল। এখানে আমাদের স্ত্রীরা তাদের আচরণ শিখাতে। একদিন কোন এক বিষয়ে আমি আমার স্ত্রীর উপর রাগ করি কিন্তু সে আমাকে প্রত্যুত্তর দেয়। আমি বিষয়টি খুবই না-পছন্দ করলাম। সে বলল আপনি কেন তা না পছন্দ করছেন? আল্লাহর কসম, রাসুলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণীগণও তো তাঁর কথার প্রত্যুত্তর করেন এবং কোন কোন সময় তাদের কেউ কেউ দিন থেকে রাত পর্যন্ত কথাবার্তা বন্ধ করে দেন। পরে আমি হাফসাকে বললাম তোমরা কি রাসুলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার প্রত্যুত্তর কর? সে বললঃ হ্যাঁ আমাদের কেউ কেউ দিন থেকে রাত পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে কর্থাবর্তা বন্ধ করে থাকে। আমি বললামঃ তোমাদের মধ্যে যে এমন কাজ করে সে তো লাঞ্ছিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত। রাসুলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ক্রোধের কারণে তার উপর আল্লাহর ক্রোধান্বিত হওয়া থেকে তোমাদের কেউ কি নিজেকে নিরাপদ মনে কর? এমতবস্থায় সে তো ধ্বংস হয়ে গেল। তখন রাসুলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্মিত হাসলেন। আমি বললাম হাফসাকে বলেছি, রাসুলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার প্রত্যুত্তর করবে না এবং তার কাছে কোন কিছু চাইবে না। তোর যা মন চায় আমার কাচেই চেয়ো। তোমর যে সখী (আয়িশা) তোমার চেয়েও সুন্দরী এবং রাসুলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট অধিক প্রিয়,তার অবস্থা যেন তোমাকে ধোকায় না ফেলে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরেক বার স্মিত হাসলেন। আমি বললাম ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি কি আরো স্বচ্ছন্দ হব? তিনি বললেন হ্যাঁ। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন আমি মাথা উঠালাম। সারা ঘরে তিনটা চামড়া ব্যতীত আর কিছুই নজরে পড়ল না। বললাম ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহর কাছে দু’আ করুন। তিনি যেন আপনার উম্মতকে স্বচ্ছন্দ্য দান করেন। পারস্য ও রোমবাসীরা আল্লাহর ইবাদত করেনা অথচ তিনি তাদের কত অর্থ-বৈভব দিয়েছেন। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোজা হয়ে বসলেন। বললেন হে খাত্তাব পুত্র! তুমি কি সন্দেহে আছ নাকি? এরা তো এমন সম্প্রদায় যাদের ত্বরা করে পার্থিব জীবনেই তাদের ভাল প্রতিদান সমূহ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ রাসুলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কসম করেছিলেন যে, এক মাস পর্যন্ত স্ত্রীদের কাছে যাবেন না। এ কারণে আল্লাহ তা’য়ালা তাকে সোহাগ ভরে ভৎর্সনা করেন এবং কসমের কাফফারা প্রদানের বিধান দেন। যুহরী (রহঃ) বলেরনঃ উরওযা বর্ণনা করেছেন যে, আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেনঃ উনত্রিশ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর রাসুলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে এলেন এবং আমার থেকে (থাকা না থাকার এখতিয়ার প্রদান বিষয়টি) শুরু করেন। বললেন হে আয়িশা! আমি তোমাকে একটি বিষয় বলেছি। তোমার পিতামাতার সঙ্গে পরামর্শ ব্যতিরেকে এ ব্যাপারে কোন তাড়াহুড়া করবে না। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন এর পর তিনি তেলওয়াত কররেন। (يا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لأَزْوَاجِكَ) হে রাসুল! আপনি আপনার স্ত্রীদের বলে দিন। তোমরা যদি পার্থিব জীবন এবং এর ভূষন কামনা কর তবে এস আমি তোমাদিগের ভোগ-সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দেই এবং সৌজন্যের সাথে তোমাদের বিদাই দেই। আর যদি তোমরা আল্লাহ, তার রাসূল ও আখিরাত কামনা কর,তবে তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল, আল্লাহ তাদের জন্য মহাপ্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন। (সূরা আহযাব ৩৩ঃ ২৮-২৯) আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেনঃ তিনি জানতেন, কসম আল্লাহর, আমার পিতামাতা তাকে পরিত্যাগ করার পরামর্শ আমাকে কখনও দিবেন না। আমি বললাম এ বিষয়ে আমি আমার পিতামাতার সঙ্গে কি পরামর্শ করব? আমিতো অবশ্যই আল্লাহ তাঁর রাসূল এবং আখিরাতের আবাসই কামনা করি। মা’মার (রহঃ) বলেনঃ আয়্যুব বর্ণনা করেন যে, আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিলেনঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার স্ত্রীদের অবহিত করবেন না যে, আমি আপনাকে গ্রহণ করেছি। রাসুলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা তো আমাকে এক মুবাল্লিগ (বাণী প্রচারক) করে পাঠিয়েছেন কষ্টদানকারী হিসেবে আমাকে পাঠান নি। হাসান, সহীহ হাদিস সিরিজ ১৫১৬, মুসলিম জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ৩৩১৮ [আল মাদানী প্রকাশনী] হাদীসটি হাসান- সহীহ-গারীব। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে একাধিক সূত্রে এটি বর্ণিত আছে।